বিজ্ঞাপন
মশার কামড় খুব ছোট একটি ঘটনা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ত্বকে বসে মশা রক্ত খেয়ে উড়ে যায়। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরই সেই জায়গায় দেখা দেয় ছোট লালচে ফোলা, শুরু হয় চুলকানি। কখনো আবার কামড়ের জায়গা বেশ বড় হয়ে ফুলে যায়। প্রশ্ন হলো, মশার কামড়ে আসলে ত্বকের ভেতরে কী ঘটে?
এর মূল কারণ মশার কামড় নয়, বরং মশার লালা এবং সেটির বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া। স্ত্রী মশা রক্ত খাওয়ার সময় ত্বকে তার মুখাংশ ঢুকিয়ে লালা প্রবেশ করায়। এই লালায় এমন কিছু প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান থাকে, যা রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে সাহায্য করে, যাতে মশা সহজে রক্ত খেতে পারে। কিন্তু মানুষের শরীর এই উপাদানগুলোকে অপরিচিত পদার্থ হিসেবে শনাক্ত করতে পারে।
লালার কারণেই শুরু হয় প্রতিক্রিয়া
মশার লালা ত্বকে ঢোকার পর শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। এই প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হিস্টামিন নামের একটি রাসায়নিক। শরীরে হিস্টামিন তৈরি বা নিঃসৃত হলে কাছাকাছি রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয় এবং রক্তনালির দেয়াল দিয়ে তরল আশপাশের টিস্যুতে বেরিয়ে আসতে পারে। এর ফলেই কামড়ের জায়গায় লালচে ভাব ও ফোলাভাব দেখা দেয়। অর্থাৎ কামড়ের জায়গাটি লাল হয়ে ওঠা এবং ফুলে যাওয়ার পেছনে শুধু মশার হুলের আঘাত দায়ী নয়; শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়াও এর বড় কারণ।
আরও পড়ুন
মানুষের আগেই পৃথিবীতে রাজত্ব ছিল মশার!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মশা কামড়ালে চুলকায় কেন?
হিস্টামিন শুধু রক্তনালির ওপর প্রভাব ফেলে না, ত্বকের সংবেদনশীল স্নায়ুর ওপরও কাজ করে। মশার লালার উপাদান এবং হিস্টামিন ত্বকের নির্দিষ্ট রিসেপ্টর ও স্নায়ুপথকে সক্রিয় করতে পারে। তখন মস্তিষ্কে চুলকানির অনুভূতি পৌঁছে যায়। তাই মশা চলে যাওয়ার পরও কামড়ের জায়গায় চুলকানি থেকে যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয় আছে। শুধু হিস্টামিন দিয়েই মশার কামড়ের সব ধরনের চুলকানি ব্যাখ্যা করা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, লিউকোট্রিন, ট্রিপটেজ এবং বিভিন্ন সাইটোকাইনসহ অন্য কিছু প্রদাহ-সৃষ্টিকারী উপাদানও চুলকানিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কামড়ের কয়েক ঘণ্টা পর বা পরের দিন যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, সেটি তাৎক্ষণিক হিস্টামিন প্রতিক্রিয়ার চেয়ে আলাদা রোগপ্রতিরোধী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে সবার শরীরে প্রতিক্রিয়া এক রকম নয়
একই প্রজাতির মশা দুজন মানুষকে কামড়ালেও দুজনের ত্বকে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ছোট একটি লাল দাগ হয়, কারও ক্ষেত্রে বড় ফোলা তৈরি হয় এবং কয়েক দিন পর্যন্ত চুলকানি থাকতে পারে।
এর একটি কারণ হলো মশার লালার উপাদানের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতার পার্থক্য। বারবার মশার কামড়ের সংস্পর্শে এলে শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা মশার লালার কিছু প্রোটিনের বিরুদ্ধে আইজিই নামের অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। এগুলো ত্বকের মাস্ট সেলের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পরবর্তী কামড়ে হিস্টামিনসহ বিভিন্ন প্রদাহ-সৃষ্টিকারী উপাদান নিঃসরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই কারো কামড়ের জায়গা সামান্য চুলকায়, আবার কারো ক্ষেত্রে বড় আকারের স্থানীয় প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
চুলকানি সহ্য করা কঠিন হওয়ায় আমরা সাধারণত জায়গাটি আঁচড়াতে শুরু করি। কিন্তু অতিরিক্ত আঁচড়ালে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। এতে ক্ষত তৈরি, দাগ বা ত্বকের রঙের পরিবর্তন এবং কখনো দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেক সময় স্থায়ী দাগ হয়ে যায়।
তাই মশার কামড়ের পর চুলকানি হওয়া আসলে শরীরের একটি প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ার অংশ। মশার লালা ত্বকে ঢোকার পর সেটিকে শনাক্ত করে শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা সক্রিয় হয়; হিস্টামিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রভাবে রক্তনালি প্রসারিত হয়, আশপাশের টিস্যুতে তরল জমে এবং সংবেদনশীল স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফল পরিচিত সেই লাল, ফোলা ও চুলকানো মশার কামড়।
আরও পড়ুন
পুরুষাঙ্গ বড় করতে এত মাতামাতি কেন, কী বলে ইতিহাস
তবে বিজ্ঞান এখনো মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনি। গবেষণায় হিস্টামিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত হলেও, হিস্টামিনের পাশাপাশি আরও অনেক লালা-উপাদান, রোগপ্রতিরোধী কোষ ও স্নায়বিক প্রক্রিয়া এই ছোট্ট কামড়কে এতটা বিরক্তিকর করে তোলে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, আমেরিকান ফ্যামিলি কেয়ার, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
কেএসকে
বিজ্ঞাপন