বিজ্ঞাপন
ঘুমের মান ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আজকাল নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে। প্রশান্তিময় গভীর ঘুমের সেরা উপায় কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নিত্যনতুন পরামর্শ দিচ্ছেন। মুসলমানদের মধ্যেও অনেকে ঘুমের ঘাটতি নিয়ে সমস্যায় ভোগেন এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শও করেন। অথচ নবীজির (সা.) জীবনধারা ও বাণী থেকে এ বিষয়ে যে চমৎকার দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায় সে বিষয়ে তারা বেখবর। মানুষের সারাদিনের পরিশ্রমের পর মানুষের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য ঘুম যদিও একটি শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন, তথাপি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘুম মহান আল্লাহর কুদরতের এক অপরূপ নিদর্শন, বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ নেয়ামত এবং এটি ইবাদতও বটে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ঘুম
ইসলামে ঘুম আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামত ও তাঁর সুনিপুণ সৃষ্টির একটি নিদর্শন। সারাদিনের শ্রম ও ব্যস্ততার পর মানুষের শরীর ও মনকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি নির্দিষ্ট বিশ্রামকাল প্রয়োজন। এই প্রয়োজন পূরণের জন্যই আল্লাহ তাআলা রাত ও ঘুম সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনিই তো সেই সত্তা, যিনি রাতকে করেছেন তোমাদের জন্য আবরণস্বরূপ এবং ঘুমকে করেছেন বিশ্রাম। (সুরা ফুরকান: ৪৭)
এখানে রাত্রির অন্ধকারকে আবরণের মতো বলা হয়েছে যা সবকিছু ঢেকে দেয়, আর ঘুমকে বলা হয়েছে \'সুবাত\' বা বিশ্রাম। ভাষাবিদদের মতে, \'সুবাত\' শব্দের মূল অর্থ হলো কেটে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন হওয়া; যা নিস্তব্ধতা, মানসিক শান্তি এবং ক্লান্তি ও কর্মব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতির দিকে ইঙ্গিত করে। (রাগেব ইসফাহানি, আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন)
সুতরাং ইসলামে ঘুম নেয়ামত ও ইবাদত; নিজের শরীরকে সঠিক বিশ্রাম দিয়ে জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জনে পুনরুজ্জীবিত হওয়াও আল্লাহ তাআলার অন্যতম এক নির্দেশ।
ঘুমের সুন্নত ও আদব
১. রাতে দ্রুত ঘুমানো
রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে দ্রুত ঘুমানোর ওপর জোর দিতেন এবং বিনা প্রয়োজনে রাত জাগা অপছন্দ করতেন। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনিই আপনাদের জন্য রাতকে বানিয়েছেন, যাতে আপনারা তাতে বিশ্রাম নিতে পারেন। (সুরা ইউনুস: ৬৭)
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইশার নামাজের আগে ঘুমানো এবং ইশার পর অহেতুক কথাবার্তা বা গল্পগুজব করা অপছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি: ৫৬৮, সহিহ মুসলিম: ৬৪৭) উম্মুল মুমিনীন আম্মাজান আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-এর অভ্যাসের বর্ণনায় বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) ইশার আগে ঘুমাতে এবং ইশার পর গল্পগুজব করতে দেখিনি; হয় তিনি জিকিরে রত থেকে সওয়াব অর্জন করতেন, না হয় ঘুমিয়ে পড়তেন। (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২১৫৪)
তবে দ্বীনি জ্ঞান চর্চা, মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কোনো আলোচনা, কিংবা মেহমান ও পরিবারের তদারকির মতো বিশেষ প্রয়োজনে এশার পর কিছু সময় জাগা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। (সুনানে তিরমিজি: ১৬৯)
অযথা রাত জাগলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মাঝে মাঝে ফজরের নামাজও কাজা হয়ে যায়। দ্রুত ঘুমালে ফজর ও তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা সহজ হয়। ভোরের বরকতও অর্জন করা যায়।
২. দরজা বন্ধ করা এবং পাত্র ঢেকে রাখা
রাতে ঘুমানোর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরের দরজা বন্ধ করা এবং পানীয় ও খাবারের পাত্র ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা ঘুমানোর সময় প্রদীপ নিভিয়ে দেবে, দরজা বন্ধ করবে, পানির পাত্রের মুখ বেঁধে রাখবে এবং খাবারের পাত্র ঢেকে রাখবে। (সহিহ বুখারি: ৬২৯৬, সহিহ মুসলিম: ২০১২) হাদিসে আরও এসেছে, তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা বন্ধ করো, কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। (সহিহ মুসলিম: ২০১২)
এই নির্দেশনার মাধ্যমে বাহ্যিক সুরক্ষা ও জীবাণুমুক্ত থাকার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
৩. আগুন ও প্রদীপ নিভিয়ে নেওয়া
ঘুমের সময় ঘরে আগুন বা প্রদীপ জ্বালানো অবস্থায় রাখতে নিষেধ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই আগুন তোমাদের শত্রুর মতো; তাই ঘুমানোর সময় তা নিভিয়ে ঘুমাও। (সহিহ বুখারি: ৬২৯৪, সহিহ মুসলিম: ২০১৬) অন্য বর্ণনায় এসেছে: তোমরা যখন ঘুমাতে যাবে, তখন প্রদীপ নিভিয়ে দেবে। (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৪৭)
বর্তমান যুগের নিরিখে এর আধুনিক প্রয়োগ হলো, রাতের বেলা অনিরাপদ বৈদ্যুতিক হিটার, গ্যাসের চুলা, চার্জার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম চালু রেখে না ঘুমানো, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যায় (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
৪. অজু করে বিছানায় যাওয়া
পবিত্র অবস্থায় ঘুমানো সুন্নত। নবীজি (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যখন তুমি তোমার বিছানায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নেবে। (সহিহ বুখারি: ২৪৭, সহিহ মুসলিম: ২৭১০)
অজুর মাধ্যমে পবিত্রতা ও প্রশান্তি অর্জিত হয়। এ ছাড়া রাতে ঘুমানোর আগে হাত ধুয়ে নেওয়াও জরুরি, বিশেষ করে হাতে কোনো খাবারের তেল বা দুর্গন্ধ থাকলে। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি হাতে চর্বি বা খাবারের কণা মেখে ঘুমিয়ে পড়ল এবং এতে তার কোনো ক্ষতি হলো, সে যেন নিজেকেই দায়ী করে। (সুনানে তিরমিজি: ১৮৬০, সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫২)
৫. বিছানা ঝেড়ে নেওয়া
বিছানায় শোয়ার আগে কাপড়ের খুঁট দিয়ে তা ঝেড়ে নেওয়া নবুয়তি সুন্নত। হাদিসে এসেছে, তোমাদের কেউ যখন বিছানায় শুতে যাবে, সে যেন তার কাপড়ের ভেতরের অংশ দিয়ে বিছানাটি ঝেড়ে নেয়; কারণ সে জানে না যে তার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কী এসেছে। (সহিহ বুখারি: ৬৩২০, সহিহ মুসলিম: ২৭১৪)
৬. ডান কাৎ হয়ে ঘুমানো
রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় ডান কাৎ হয়ে শোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ২৪৭, সহিহ মুসলিম: ২৭১০)
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও ডান কাৎ হয়ে শোয়ার নানা শারীরিক উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে একজন মুমিনের কাছে রাসুলের (সা.) অনুসরণের গুরুত্ব শারীরিক উপকারিতার চেয়ে বেশি।
৭. ঘুমানোর বিশেষ দোয়া পাঠ করা
নবীজি (সা.) রাতে ঘুমানোর পূর্বে একটি পরম তাৎপর্যপূর্ণ দোয়া পাঠ করতে শিখিয়েছেন, যা নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়ার মাধ্যম। তিনি বলেন, শোয়ার পর বলবে:
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আসলামতু ওয়াজহিয়া ইলাইকা, ওয়া ফাওওয়াদতু আমরি ইলাইকা, ওয়া আলজা\'তু জাহরি ইলাইকা, রাগবাতান ওয়া রাহবাতান ইলাইকা, লা মলজাআ ওয়া লা মানজা মিনকা ইল্লা ইলাইকা, আল্লাহুম্মা আমানতু বিকিতাবিকাল্লাজি আনঝালতা, ওয়া বিনাবিয়্যিকাল্লাজি আরসালতা।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার কাছে সমর্পণ করলাম, আমার সমস্ত বিষয় আপনার ওপর ন্যস্ত করলাম এবং আপনার প্রতি আশা ও ভয় নিয়ে আপনার ওপর ভরসা করলাম। আপনি ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল ও নাজাতের জায়গা নেই। হে আল্লাহ! আমি আপনার নাজিলকৃত কিতাব এবং প্রেরিত নবির ওপর ঈমান আনলাম। (সহিহ বুখারি: ২৪৭, সহিহ মুসলিম: ২৭১০)
৮. কোরআনের নির্বাচিত কিছু আয়াত পাঠ
রাতের বেলা সব ধরনের বিপদ ও অপশক্তির প্রভাব থেকে বেঁচে থাকতে নবীজি (সা.) কোরআনের কিছু নির্দিষ্ট অংশ তেলাওয়াতের পরামর্শ দিয়েছেন:
আয়াতুল কুরসি: শোয়ার সময় এটি পাঠ করলে সারারাত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকে এবং শয়তান কাছে ঘেঁষতে পারে না। (সহিহ বুখারি: ২৩১১)
সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস: নবীজি (সা.) প্রতি রাতে শোয়ার সময় দুই হাত একত্র করে এই তিন সুরা পড়ে তাতে ফুঁ দিতেন এবং হাত দুটি দিয়ে মাথার দিক থেকে শুরু করে নিজের শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছে নিতেন। এভাবে তিনি তিনবার করতেন (সহিহ বুখারি: ৫০১৭)
সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে (সহিহ বুখারি: ৫০০৯, সহিহ মুসলিম: ৮০৮)
৯. রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বা অনিদ্রা হলে যা করণীয়
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে নবীজি (সা.) এক বিশেষ জিকির পাঠ করতে বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রাতে জেগে উঠে বলে:
বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়াহুওয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদির, আলহামদুলিল্লাহি ওয়া সুবহা নাল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা ক্যুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
বাংলা অর্থ: আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরিক নেই, রাজত্ব তারই, আর সমস্ত প্রশংসা তারই, তিনি সব কিছুর ওপর শক্তিমান। পবিত্র-মহান আল্লাহ, গুনাহ থেকে বাঁচার এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই আল্লাহর তাওফিক ছাড়া।
এরপর যদি সে বলে, ‘আল্লাহুম্মা-গফিরলি’ (হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন) অথবা কোনো দোয়া করে, তবে তার দোয়া কবুল করা হয় (সহিহ বুখারি: ১১৫৪)
মহানবীর (সা.) এই সুন্নতগুলো পালন করলে আমরা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে উপকৃত হবো, শয়তানি অপশক্তিসমূহের প্রভাব থেকেও বেঁচে থাকবো এবং আত্মিক প্রশান্তিও অনুভব করবো। ফলে অনিদ্রা, দুঃস্বপ্ন দেখা, রাতে ভয় পাওয়া, ঘুমের মধ্যে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি সমস্যা দূর করতেও এই সুন্নতগুলো সাহায্য করতে পারে।
সূত্র: ইসলাম অনলাইন ডট কম
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন