বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের অতিরিক্ত নির্ভরতা, ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার এবং ক্ষতিকর কনটেন্টে এক্সপোজার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা মামলায় মেটা বড় অঙ্কের টাকায় সমঝোতা করেছে।
চুক্তিটি আদালতের অনুমোদন পেলে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ কিছু বাধ্যতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে মেটাকে ১০ বছর ধরে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অনুসরণ করতে হবে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অর্থের পরিমাণ। মেটার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতার মোট অঙ্ক ১৮ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা)। তবে পুরো অর্থ একবারে পরিশোধ করা হবে না। ১০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন কিস্তিতে অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মামলায় অংশ নেওয়া অঙ্গরাজ্যগুলো প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ পাবে। বাকি অংশ পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে ইউটিউব ও টিকটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলাদা শর্ত পূরণের ওপর।
দিনে দুই ঘণ্টা ব্যবহারের সীমা
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কিশোরদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ। ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার একটি ডিফল্ট সীমা রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সীমা পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় হবে না। অভিভাবক চাইলে সেটি তুলে দিতে পারবেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের বড় অংশ অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
আরও পড়ুন
১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করলো আরেক দেশ
রাতের ব্যবহার নিয়েও থাকছে কড়াকড়ি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীরা ডিফল্টভাবে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবেন না। রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ব্লকিং ব্যবস্থা চালু রাখার কথা রয়েছে। প্রয়োজন হলে অভিভাবক সেটি পরিবর্তন করতে পারবেন।
এছাড়া রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা এবং স্কুল চলাকালীন সময়ে নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও থাকবে। এর উদ্দেশ্য হলো পড়াশোনা, ঘুম কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টান কমানো।
লাইক ও সৌন্দর্য ফিল্টারেও বিধিনিষেধ
কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগের জায়গাগুলোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৮ বছরের কম বয়সীদের পোস্টে কতজন লাইক বা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সেই সংখ্যা দেখানো হবে না। একই বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য চেহারা পরিবর্তনকারী ইমেজ ফিল্টার ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
এ ধরনের ফিচার কিশোরদের মধ্যে সামাজিক তুলনা বা চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে অন্তত মেটার প্ল্যাটফর্মে এই অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যক্তিকরণবিহীন ফিড বেছে নেওয়ার সুযোগও রাখা হবে। অর্থাৎ অ্যালগরিদমের ব্যক্তিগত পছন্দনির্ভর সুপারিশের বাইরে গিয়ে কনটেন্ট দেখার বিকল্প থাকবে।
ক্ষতিকর কনটেন্টের অভিযোগে দ্রুত জবাব
শুধু ব্যবহারের সময় কমানো নয়, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কিশোর ব্যবহারকারীরা সম্ভাব্য ক্ষতিকর কনটেন্ট সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর জন্য উন্নত ব্যবস্থা পাবেন। এসব অভিযোগের ৯০ শতাংশের জবাব ছয় ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভিভাবকদের জন্যও নজরদারি বা প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের সুবিধা আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মেটা। ফলে সন্তান কীভাবে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, সেটি পর্যবেক্ষণের সুযোগ অভিভাবকদের হাতে আরও বেশি থাকতে পারে।
বয়স যাচাই হবে আরও কঠোর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়সসীমা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ব্যবহারকারীর প্রকৃত বয়স নিশ্চিত করা। নতুন সমঝোতায় সেই জায়গাটিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেটাকে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার জন্য আরও শক্তিশালী বয়স যাচাই ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের শনাক্ত করে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
আরও পড়ুন
কখন পোস্ট করলে ইনস্টাগ্রাম রিলসে ভিউ বাড়বে, জানেন?
শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের বিষয়টিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। অভিযোগ ছিল, মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের তথ্য যথাযথভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। তবে মেটা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তরুণদের নিরাপত্তা বাড়াতে তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে এবং নতুন সমঝোতাকেও সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছে।
শুধু মেটাকে বদলালে কি সমস্যার সমাধান হবে?
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিশোররা যদি একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কমিয়ে অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যায়, তাহলে শুধু একটি কোম্পানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। মেটাও তাদের বক্তব্যে এই বিষয়টি তুলে ধরেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, একটি প্ল্যাটফর্মে কিশোরদের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে তারা সহজেই অন্য অ্যাপে চলে যেতে পারে। তাই ইউটিউব ও টিকটকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকেও একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এই কারণেই সমঝোতার একটি অংশ ইউটিউব ও টিকটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের শর্তটি যুক্ত করা হয়েছে।
১০ বছরের চুক্তি, তবে সব নিয়ম সমান সময় থাকবে না
সমঝোতার বেশিরভাগ সংস্কারমূলক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে শিশু-কিশোরদের দৈনিক ব্যবহারের সীমার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের মেয়াদ পাঁচ বছর হতে পারে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় কি না, তার ওপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
এদিকে মেটা জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এই সমঝোতা ও সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যয়ের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হিসাবভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
এক মামলার বাইরে বড় আইনি চাপ
এই সমঝোতা মেটার জন্য একটি মামলার নিষ্পত্তি হলেও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কোম্পানিটির আইনি চাপ এখানেই শেষ হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের গোপনীয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে আরও বহু মামলা রয়েছে।
এর আগে নিউ মেক্সিকোতেও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে মামলায় মেটাকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়েছে। একই ধরনের আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য এলাকাতেও। ফলে ১৮ বিলিয়ন ডলারের এই সমঝোতা শুধু একটি আর্থিক নিষ্পত্তি নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের জন্য নিরাপত্তার মানদণ্ড কীভাবে বদলাতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
আদালতের অনুমোদনের পর চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হলে অভিভাবক, শিশু-কিশোর এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তিন পক্ষের জন্যই নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সময়সীমা, রাতের ব্যবহার বন্ধ, বয়স যাচাই ও অ্যালগরিদমিক ফিডের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতে অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: বিবিসি, ফোর্বস
কেএসকে
বিজ্ঞাপন