কুমিল্লার সীমান্তবর্তী গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ সড়কে স্থাপিত কোটি টাকার তিন শতাধিক সোলার লাইট একে একে উধাও হয়ে গেছে। ফলে রাত নামলেই অন্ধকারে ডুবে যায় গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত সড়ক। আর এই সুযোগে বাড়ছে চোরাচালান, ছিনতাই ও মাদক কারবার। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ও আশপাশের এলাকার লক্ষাধিক মানুষ।
২০২৩ সালে কুমিল্লা সদর উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ সড়কে পাঁচ শতাধিক সোলার লাইট স্থাপন করা হয়। শহরের সঙ্গে গোমতীর উত্তর পাড়ের পাঁচথুবী ও আমড়াতলী ইউনিয়নের মানুষের রাতের যাতায়াত নিরাপদ ও সহজ করাই ছিল প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ খুঁটিতে লাইট নেই, কোথাও আবার খুঁটিও উধাও। এতে আলোহীন হয়ে পড়া সড়কটি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা জানায়, এক সময় সন্ধ্যার পর গোমতীর দুই পাড়ে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসতেন অনেকেই। টিক্কারচর ব্রিজ সরগরম থাকত দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমজমাট থাকতো। কিন্তু এখন লাইট চুরির ঘটনায় অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে জায়গাগুলো। ফলে কমে গেছে মানুষের চলাচল, বেড়েছে মাদকসেবী ও অপরাধীর দৌরাত্ম্য।
আরও পড়ুন
ঐতিহ্যবাহী ভাসানী হল / দিনে পানের দোকান-ট্রাকস্ট্যান্ড, রাতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ীরা জানান, রাত ৯টার পর টিক্কারচর ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইকারী মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষদের টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে উল্টো মারধর করা হয়।
সোলার লাইট চুরি হওয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ সড়ক/ ছবি: জাগো নিউজ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোলার লাইট স্থাপনের পর রাতেও নিরাপদে চলাচল করা যেতো। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত এ সড়ক ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়। প্রয়োজন ছাড়া কেউ রাতে এ পথে চলাচলের সাহস পান না। তাদের প্রশ্ন, একের পর এক শত শত লাইট কারা খুলে নিলো। সরকারি সম্পদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর জবাবদিহি কোথায়।
সুবর্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা নূর হোসেন রাব্বি জাগো নিউজকে বলেন, টিক্কাচর উওর পাড় গোলাবাড়ি রোডে প্রতিদিন চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কখনো অস্ত্র ঠেকিয়ে সব নিয়ে নেয়। আবার কখনো অটো বা মিশুক চালককে মারধর করে গাড়ি নিয়ে নেয়। গত কয়েকদিন আগেও জালুয়া পাড়া এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মিশুক চালককে মারধর করে অন্ধকারে তার টাকা, মোবাইল এবং মিশুক গাড়িটি নিয়ে যায়। এরপর প্রশাসন নীরব কেন বুঝে আসে না।
পাঁথুবি গ্রামের আমির হোসন বলেন, গোমতীর বেড়িবাঁধ মাদক কারবারিদের সর্গরাজ্য বলা যায়। রাত ৮টার পর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা থেকে মাদকদ্রব্য, ভারতীয় প্রসাধনী ও তালাসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এসবের সঙ্গে জড়িত অধিকাশই যুবক। আর প্রতি রাতে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাতো আছেই।
আরও পড়ুন
বগুড়ায় একই প্রকল্পে ‘ডাবল’ বরাদ্দ!
এ বিষয়ে পাঁচথুবী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল বলেন, সীমান্তমুখী এই সড়কটি চোরাকারবারিদের চলাচলের পথ হওয়ায় তারা নিজেদের সুবিধার জন্য পরিকল্পিতভাবে সোলার লাইট নষ্ট ও চুরি করেছে। এখন অন্ধকারের সুযোগে ছিনতাইকারীদের উৎপাতও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সক্রিয় নজরদারি থাকলে অপরাধ কর্মকাণ্ড কমে আসবে।
চুরি হয়ে গেছে সোলার লাইট/ ছবি: জাগো নিউজ
কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, সোলার লাইট চুরির খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ ঘটনায় কুমিল্লা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশিয়াত আকতারকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে লাটই চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, কুমিল্লায় সদরে রাতে আমাদের ১১টি টিম কাজ করে। এর মধ্যে ২টি টিম পাঁথুবি এলাকায় সময় দেয়। তবে গোমতীর বেঁড়িবাধ এলাকায় থেকে এখনো পর্যন্ত চুরি-ছিনতাইয়ের বিষয়ে কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, গোমতীর বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে চোরাকারবারিরা মাদক কিংবা ভারতীয় বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে যাতায়াতের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমরা যখনই অবৈধ মালামাল পরিবহনের তথ্য পাই সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করি।
এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) রোজী আকতার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠিয়েও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনএইচআর