যাত্রী, বাস মালিক ও শ্রমিকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে নির্মাণ করা হয়েছিল রাজবাড়ী বাস টার্মিনাল। কিন্তু নির্মাণের ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও চালু হয়নি টার্মিনালটি। ফলে জেলা শহরের বড়পুল ও নতুন বাজারের মুরগির ফার্ম এলাকা পরিণত হয়েছে অলিখিত বাস টার্মিনালে। এসব স্থান থেকেই যাত্রীরা বাসে ওঠানামা করছেন, আর সেখানেই গড়ে উঠেছে বাসের টিকিট কাউন্টার।
বাস টার্মিনালটির মূল কার্যক্রম বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো অবকাঠামো। এখান থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায় না, যাত্রীও ওঠানামা করেন না। নেই কোনো টিকিট কাউন্টারও। মূল ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও যাত্রীদের বিশ্রামকক্ষ, টয়লেট, টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে টার্মিনালের মূল ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে বাস, ট্রাকসহ নানা ধরনের যানবাহন মেরামতের কাজ চলছে। ফলে টার্মিনালটি কার্যত গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। ভবনের এক পাশে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা থাকলেও চেয়ারগুলো ভেঙে যাওয়ায় সেগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী। অধিকাংশ কক্ষই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দু-একটি কক্ষ ব্যবহার হলেও সেখানে রাখা হয়েছে যানবাহন মেরামতের বিভিন্ন সরঞ্জাম।
আরও পড়ুন
‘মালাই চা’-তে ভাগ্য খুলেছে হযরত আলীর
এছাড়া টার্মিনালের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে দিন দিন নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। যাত্রীদের আনাগোনা না থাকায় টার্মিনাল ঘিরে গড়ে ওঠা খাবার হোটেলসহ অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ক্রেতার অভাবে কোনো রকমে টিকে আছে। যাত্রী, চালক ও শ্রমিকদের পদচারণা কম থাকায় রাতে টার্মিনাল এলাকায় বাড়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা। একই সঙ্গে সেখানে মেরামত বা নির্মাণাধীন থাকা গাড়ি থেকে প্রায়ই চুরি হচ্ছে তেল ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
অন্যদিকে জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত অর্থ চুক্তি অনুযায়ী রাজবাড়ী পৌরসভাকে ধাপে ধাপে পরিশোধ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। অথচ নিয়মিত ইজারা দিয়ে আয় করছে পৌরসভা।
জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন রাজবাড়ী জেলা শহরের শ্রীপুরে প্রায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির উপর ১ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যায়ে বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে টার্মিনালটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম। পরবর্তীতে নির্মাণ অর্থ পরিশোধের চুক্তিতে ২০০০ সালে বাস টার্মিনালটি রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে জেলা পরিষদ।
যাত্রীরা জানান, বাস টার্মিনালটি শহরের মূল কেন্দ্র থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হওয়ায় সেখানে যাতায়াত করা ঝামেলার। বর্তমানে শহরের ভেতরে মালিক সমিতি, বড়পুল ও মুরগি ফার্ম এলাকায় বাস দাঁড়ায়, যা তাদের ওঠানামার জন্য বেশ সুবিধাজনক। তবে কর্তৃপক্ষ যদি সব যাত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে বাস টার্মিনাল থেকেই ওঠানামা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তারা সেটি মেনে নিতে রাজি আছেন। এর আগে টার্মিনালটি পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি যাত্রী ও পরিবহন কর্মীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন
মানুষের সঙ্গে ‘সংঘাতে’ হেরে যাচ্ছে রাঙ্গামাটির হাতি
শিক্ষার্থী রাজিব বলেন, বাস টার্মিনালটি সচল না থাকায় বর্তমানে এটি একটি গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সহযোগিতা এবং সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে টার্মিনালটি দ্রুত সংস্কার করে চালু করা হোক। এ বিষয়ে শুধু কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর না করে আমাদের সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যত্রতত্র বাস না থামানো বা অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে ওঠানামা করার অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। এতে একদিকে যেমন শহরের যানজট নিরসন হবে, অন্যদিকে আমাদের ভোগান্তি কমে আসবে।
গাড়ি মেরামত করতে আসা ওয়াসিম বলেন, টার্মিনালের বর্তমান পরিবেশ খুবই খারাপ। চারদিকে ময়লা-আবর্জনা ভরা। চুরির মতলবে সবসময় মাদকসেবীরা ঘোরাঘুরি করে। তাই টার্মিনালটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা এবং যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।
টার্মিনালের ব্যবসায়ী লিটন বলেন, এখানে এখন আর কোনো দূরপাল্লা বা লোকাল বাস আসে না। কোনো টিকিট কাউন্টারও নেই। ফলে এখানে যাত্রী ওঠানামাও করে না। টার্মিনাল এলাকা এখন গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে শুধু মেরামতের জন্য কিছু গাড়ি আসে। রাতে বাসগুলো নতুন বাজার মুরগির ফার্ম এলাকায় পার্কিং করা থাকে, সেখানে জায়গা না হলে কিছু বাস টার্মিনালে এনে রাখা। টার্মিনাল সচল না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। লোকজন কম থাকার সুযোগে মাদকসেবীরা নিয়মিত বাসের ব্যাটারি ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত টার্মিনালটি দ্রুত চালু করতে হবে।
হোটেল শ্রমিক মোহাম্মদ লিটন বলেন, এই বাস টার্মিনালকে এখন আর কোনোভাবেই টার্মিনাল বলা যায় না, এটি পশুর হাটের চেয়েও খারাপ হয়ে পড়েছে। পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ছেয়ে গেছে। ড্রাইভার-স্টাফদের থাকার জায়গা তো দূরের কথা, এখানকার বাথরুম বা গোসলখানাও ব্যবহার উপযোগী না। যাত্রী ও বাস যাতায়াত না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকসান হচ্ছে। এখন কেবল নষ্ট গাড়িগুলো গ্যারেজের কাজের জন্য এখানে আনা হয়। শুরুর দিকে এই টার্মিনালে ১২ থেকে ১৪টি খাবার হোটেল থাকলেও ক্রেতার অভাবে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র দুটিতে। সেগুলোতেও ঠিকমতো বেচাকেনা হয় না।
চর্মকার রাজন ওরফে চাইনিজ বলেন, এখানে প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছি, যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। মাঝে অল্প কিছুদিন টার্মিনালটি চালু করা হলেও পরবর্তীতে তা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। যত্রতত্র ময়লা ফেলা ও অবহেলার কারণে পুরো এলাকাটিকে এখন ডাস্টবিনে পরিণত করা হয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই টার্মিনালের সামনের অংশে পানি জমে গিয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
স্থানীয় আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাস টার্মিনালটি এখন গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাতে এখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। আমি চাই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই টার্মিনালটি দ্রুত পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এটি সচল হলে যাত্রী, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবে।
রাজবাড়ী পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক বলেন, এখন পর্যন্ত জেলা পরিষদকে ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী মাসে আরও দুটি কিস্তি দেওয়াসহ পরবর্তীতে নিয়মিত পরিশোধ করা হবে। এমনকি নির্ধারিত কিস্তির বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। বাস টার্মিনালে পৌরসভার একজন বৈধ ইজারাদার রয়েছেন এবং ইজারা চুক্তি অনুযায়ী এলাকাটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সব দেখাশোনার মূল দায়িত্ব তারই। তারপরও পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হয়। জলবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে কাজ শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, টার্মিনালে বাস দাঁড়ানো বা না দাঁড়ানোর বিষয়টি পৌরসভার না। এটি মূলত পরিবহন মালিক সমিতির বিষয়। সরকার যদি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে শহরের ভেতরের পয়েন্টগুলোতে বাস দাঁড়ানো বা ওঠানামা বন্ধ করে, তবে বাসগুলো অটোমেটিক টার্মিনালে চলে যাবে।
রাজবাড়ী জেলা পরিষদ প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, ২০০০ সালে পৌরসভার কাছে বাস টার্মিনালটি হস্তান্তর করা হলেও গত ২৬ বছরে তারা পাওনা হিসেবে মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে পুরো টার্মিনালটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে চাই এই জায়গাটি জনগণের স্বার্থে সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হোক। দিনে এখানে যানবাহন মেরামত করা হলেও রাতে মাদকসেবীদের আনাগোনার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। টার্মিনালটি পুনরায় পুরোদমে চালু করতে ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি কোনো কারণে বাস টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব না হয়, তবে এখানে একটি ১০০০ আসনবিশিষ্ট মিলনায়তন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ ১ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। আমি চাই সেই টাকা এখানে ব্যবহার করা হোক। এখানে মোট ৪২২ শতাংশ জমি রয়েছে। এর অর্ধেক অংশে বাস টার্মিনাল এবং বাকি অর্ধেক অংশে জেলা পরিষদের মিলনায়তন করা সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের ভালো হবে।
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি খোন্দকার মাহমুদুল হক জুয়েল বলেন, টার্মিনাল চালুর বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরাও চাই এটি দ্রুত চালু হোক। কিন্তু যাত্রীরা যদি সেখানে যেতে না চায় তাহলে কিভাবে হবে। দূরপাল্লা ও লোকাল বাসগুলো শহরের ভেতর দিয়ে চলাচল করে, যাত্রীরাও ঠিক সেই সুবিধার সুযোগ নিচ্ছে। শহরের মুরগি ফার্ম ও বড়পুল এলাকায় যাত্রী উঠানামার ফলে সেখানে রানিং গাড়িগুলো দুই-চার মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে চলে যায়। শহরের বাইরে টার্মিনাল হওয়ায় অতিরিক্ত টাকা খরচ করে যাত্রীরা সেখানে যেতে চান না।
তিনি আরও বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি বাইপাস সড়কের দাবি জানিয়ে আসছি। বাইপাস সড়কটি বাস্তবায়িত হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতো এবং টার্মিনালটিও পুরোদমে সচল থাকতো। তবে বর্তমানে রাতের বেলা সব বাস টার্মিনালেই রাখা হয়, যা থেকে সরকার নিয়মিত রাজস্ব পাচ্ছে।
রুবেলুর রহমান/এনএইচআর/জেআইএম