বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) স্থানীয় স্ট্রেইন (ভাইরাসের স্থানীয় ধরন) থেকে উদ্ভাবিত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এইচ৯এন২ ও গোটপক্স ভ্যাকসিনের সিড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক উৎপাদন ও মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের লক্ষ্যে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে টিকা দুটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু উপস্থিত ছিলেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, দুটি ভ্যাকসিনের সিড হস্তান্তর গবেষণাগারের জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষক ও বিজ্ঞানী রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন ও জীবপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উৎপাদনে সক্ষম দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে পোল্ট্রি শিল্পে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও নারী উদ্যোক্তা যুক্ত রয়েছেন। তবে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ খাতের অন্যতম বড় হুমকি।
আরও পড়ুন
পোষা প্রাণী থেকে হতে পারে মারাত্মক রোগ, জানুন সমাধান
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এইচ৫এন১ ও এইচ৯এন২ উভয় সাবটাইপ (ভাইরাসের নির্দিষ্ট ধরন) বিদ্যমান। এইচ৯এন২-এ আক্রান্তের হার ২৩ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ডিমপাড়া মুরগির ডিম উৎপাদন ১৪ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে এর প্রভাব খামারির আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, ডিম-মাংসের সরবরাহ ও অর্থনীতিতে পড়ে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরুরি প্রয়োজনে ১৯ কোটি ডোজ এইচ৯এন২ এবং ৩১ কোটি ডোজ মিশ্র ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব ভ্যাকসিনের বাজারমূল্য ৯০০ কোটি টাকারও বেশি। দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি খামারিরা কম দামে স্থানীয়ভাবে উপযোগী ভ্যাকসিন পাবেন।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বিএলআরআই উদ্ভাবিত এইচ৯এন২ ভ্যাকসিন স্থানীয় স্ট্রেইন থেকে তৈরি হওয়ায় দেশের প্রচলিত ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি উচ্চমাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে এবং বুস্টার ডোজ (অতিরিক্ত ডোজ) দিলে ৩১ সপ্তাহ পর্যন্ত সুরক্ষামূলক মাত্রার অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধী উপাদান) বজায় রাখতে পারে।
গোটপক্স ভ্যাকসিনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ছাগল গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র খামারি ও নারী উদ্যোক্তাদের আয়ের অন্যতম উৎস ছাগল পালন। গোটপক্সে আক্রান্তের হার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ১০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অল্পবয়সী ছাগলের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন
গবাদিপশুর ক্ষুরা রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
তিনি বলেন, বিএলআরআইয়ের গোটপক্স ভ্যাকসিনটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড (দুর্বল করা জীবিত ভাইরাস দিয়ে তৈরি) ভ্যাকসিন। দুই মাস বয়সী ছাগলেও এটি প্রয়োগ করা যায়। গবেষণায় এটি বুস্টার ডোজ ছাড়াই এক বছর পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধে সক্ষম বলে পাওয়া গেছে।
ছাগল পালনকে উৎসাহিত করতে ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনের মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ওই ধারাবাহিকতায় বিএলআরআইয়ে ছাগল উৎপাদন গবেষণা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। গোটপক্স ভ্যাকসিন উদ্ভাবন সেই অগ্রযাত্রার নতুন মাইলফলক।
বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক শাকিলা ফারুক বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা ২০২১ সাল থেকে ভ্যাকসিন দুটি উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। পরে ভ্যালিডেশন কমিটির মাধ্যমে ভ্যাকসিন দুটির ভ্যালিডেশন (কার্যকারিতা ও মান যাচাই) সম্পন্ন হয়। দেশীয় স্ট্রেইন থেকে উদ্ভাবিত হওয়ায় ভ্যাকসিন দুটি ব্যয় সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্তের হার ২৩ থেকে ৭০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। গোটপক্সে আক্রান্তের হার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ১০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ফলে রোগ দুটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা করতে হবে
অনুষ্ঠানে বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক শাকিলা ফারুক প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শান জামান খানের কাছে ভ্যাকসিন দুটির সিড হস্তান্তর করেন। এ সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু উপস্থিত ছিলেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, ভ্যাকসিন দুটি গ্রহণের পর মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হবে। এরপর রিঅ্যাক্টিভিটি স্টাডি (ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর প্রতিক্রিয়া যাচাই) ও ইমিউনিটি স্টাডি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই) সম্পন্ন করে বাণিজ্যিকভাবে মাঠপর্যায়ে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এরই মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ পিপিআর (ছাগলের একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ) মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। গোটপক্স থেকেও মুক্ত হতে পারলে খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হবেন। সরকারের লক্ষ্য প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী করা। রোগমুক্ত প্রাণিসম্পদ উৎপাদন করতে পারলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ সরবরাহ করতে পারবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান ভ্যাকসিন দুটির ভ্যালিডেশন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি বলেন, এইচ৯এন২ ভ্যাকসিনটি একটি ইনঅ্যাক্টিভেটেড (নিষ্ক্রিয় ভাইরাস দিয়ে তৈরি) ভ্যাকসিন এবং লো প্যাথোজেনিক (তুলনামূলক কম ক্ষতিকর) এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
ছাগলের বিভিন্ন রোগ ও প্রতিকার : প্রথম পর্ব
এ বিজ্ঞানী আরও বলেন, তবে এইচ৯এন২ একটি আরএনএ ভাইরাস হওয়ায় এতে নিয়মিত মিউটেশন (জিনগত পরিবর্তন) ঘটে। ফলে মাঠে ছড়িয়ে থাকা ভাইরাসের ধরন পরিবর্তিত হলে ভ্যাকসিনের স্ট্রেইনও পরিবর্তন করতে হতে পারে। এ বিষয়ে বিএলআরআইকে ধারাবাহিক গবেষণা চালাতে হবে।
অধ্যাপক বাহানুর রহমান জানান, ভ্যাকসিন দুটি এখনো ল্যাব পর্যায় থেকে এসেছে। আরও পরীক্ষার জন্য টেস্ট ব্যাচ ও ফিনিশড গুডস (চূড়ান্ত উৎপাদিত ভ্যাকসিন) এর দুটি ব্যাচ তৈরি করা হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে ভ্যাকসিন দুটি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিএলআরআইয়ের কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী-গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্প উদ্যোক্তা, খামারি এবং ওষুধ ও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএমএম/এমএমকে