ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই (UPI)। প্রতিদিনের চা-দোকানের বিল থেকে শুরু করে বড় শপিংমলের কেনাকাটা, সবখানেই এই ব্যবস্থার একচেটিয়া আধিপত্য। অনেক বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সেবা ব্যবহার করে আসছেন ভারতের সাধারণ নাগরিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে সম্প্রতি লোকসভায় ‘ট্যাক্সেশন অ্যান্ড আদার লজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পাসের পর এই সেবা আর বিনামূল্যে থাকবে কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউপিআই সেবায় চার্জ বসানোর আইনি পথ তৈরি করলেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে।
নতুন বিলে কী আছে
ভারতের লোকসভায় পাস হওয়া নতুন সংশোধনীটি মূলত ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭’-এর ধারা ১০এ পরিবর্তন করার পথ প্রশস্ত করেছে।
আরও পড়ুন
এপস্টেইন ফাইলসের তথ্য / ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে নেচে-গেয়ে সময় কাটিয়েছিলেন মোদী
২০২০ সাল থেকে চালু থাকা ‘জিরো-এমডিআর’ নীতি বা শূন্য ফি ব্যবস্থার কারণে ব্যাংক ও ফিনটেক সংস্থাগুলোর তেমন লাভ হচ্ছিল না। নতুন এই আইন পাসের ফলে সরকার এখন চাইলে যে কোনো সময় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ডিজিটাল লেনদেনের ওপর মাশুল ধার্য করার আইনি ক্ষমতা লাভ করেছে।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভারতের কোটি কোটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের আশঙ্কা, ডিজিটাল ইন্ডিয়া গড়ার নামে প্রথমে বিনামূল্যে অভ্যাস করিয়ে এখন করপোরেট ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষা করতে আমজনতার পকেট কাটার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, যদি শেষ পর্যন্ত বড় অংকের চার্জ চাপানো হয়, তবে ডিজিটাল লেনদেন ছেড়ে তারা আবার পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন।
ভূ-রাজনীতি ও ট্রাম্পের চাপ
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ওয়াশিংটনের একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ কাজ করতে পারে। মার্কিন প্রশাসন সব সময়ই বিশ্ববাজারে তাদের নিজস্ব আর্থিক সংস্থা যেমন—ভিসা (Visa) এবং মাস্টারকার্ডের (Mastercard) আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। ভারতে ইউপিআই অত্যন্ত সফল ও জনপ্রিয় হওয়ার কারণে এই মার্কিন বহুজাতিক কার্ড সংস্থাগুলো বিশাল অংকের ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আরও পড়ুন
স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? ট্রাম্পকে বলেন মোদী
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের উচ্চ শুল্কনীতি এবং মার্কিন ব্যবসার প্রসারে বাধা নিয়ে বারবার সরব হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, নরেন্দ্র মোদী অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ, তবে তার শুল্কনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্তুষ্ট নয়। তাকে খুশি করতে মোদী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেও দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক সচল রাখতে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে তোষণ করতেই মোদী সরকার ইউপিআইতে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) বা লেনদেন ফি বসানোর জন্য এই আইনি সংশোধন এনেছে।
দিল্লির আত্মপক্ষ সমর্থন
তীব্র বিতর্কের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নেমেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানানো হয়েছে, ট্রাম্পকে খুশি করা বা বিদেশি কোনো চাপের তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক।
আরও পড়ুন
মোদীর সামনেই ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রাম্পের
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ জানিয়েছেন, ইউপিআই পরিকাঠামো বিশ্বের বৃহত্তম রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুধু ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৩৬৬ কোটি লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৯ লাখ কোটি রুপি।
এত বিশাল নেটওয়ার্কের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিকাঠামো বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্বের জন্য বিপুল খরচের প্রয়োজন হয়।
ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, সাধারণ গ্রাহক বা পার্সন-টু-পার্সন (P2P) লেনদেনের ওপর কোনো চার্জ বসানো হবে না। গ্রাহকদের জন্য এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকবে।
তাহলে কার পকেট থেকে যাবে এই ফি?
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যদি মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট চালুও করা হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এটি প্রযোজ্য হবে মূলত বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ‘লার্জ মার্চেন্টদের’ ওপর, তা-ও আবার নির্দিষ্ট একটি উচ্চ সীমার লেনদেনের ক্ষেত্রে।
আরও পড়ুন
প্রশংসা করে মোদীকে ‘কিলার’ বললেন ট্রাম্প
প্রাথমিক আলোচনা অনুযায়ী, দুই হাজার রুপির ওপরের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নামমাত্র বা সামান্য কিছু ফি ধার্য করা হতে পারে, যা ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের চার্জের চেয়ে অনেক কম হবে।
ভারতের ‘পেমেন্টস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ (PCI) জানিয়েছে, বর্তমানে ইউপিআই পরিচালনার খরচ মেটাতে সরকারকে বিশাল অংকের ভর্তুকি দিতে হয়। এই পরিকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর ও টেকসই করতেই এই আইনি পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য নাকি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট?
মোদী সরকারের এই পদক্ষেপকে ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন বেশ উত্তপ্ত। একদিকে বিরোধীরা একে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের কাছে দিল্লির নতিস্বীকার এবং সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।
আরও পড়ুন
‘মোদী আমার বন্ধু’ বলেই ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা ট্রাম্পের
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো ব্যবস্থাই চিরকাল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চলতে পারে না, তাই ডিজিটাল অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার স্বার্থেই এই কঠোর অথচ বাস্তবসম্মত আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ট্রাম্পের চাপ বা সন্তুষ্টির বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হলেও, শেষ পর্যন্ত ভারতের বিশাল ফিনটেক বাজারকে টিকিয়ে রাখাই দিল্লির আসল লক্ষ্য কি না, তা আগামী দিনগুলোতে সরকারের চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই পরিষ্কার হবে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নিউজ১৮, দ্য ইকোনমিক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়াকেএএ/