দুই বছর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজশাহীর রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল রক্তে। গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন তরুণ শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান। আহত হয়েছিলেন শতাধিক আন্দোলনকারী। সেই ঘটনার পর দায়ের হয় ৩০টি মামলা। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, মামলাগুলোর মধ্যে কোনোটির তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা, কোথাও চার্জশিট জমা হলেও শুরু হয়নি কার্যকর বিচার। ফলে শহীদ পরিবারের দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হচ্ছে, আর উঠছে একটাই প্রশ্ন— জুলাইয়ের আত্মত্যাগের বিচার কি সময়মতো মিলবে?
নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই তাদের ক্ষতকে আরও গভীর করা। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তড়িঘড়ি নয়, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।
রক্তাক্ত ৫ আগস্ট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল রাজশাহীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস দিনগুলোর একটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নগরীতে মিছিল বের করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহ মখদুম কলেজ ও আলুপট্টি এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি হয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যও অবস্থান নেন। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
আরও পড়ুন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে পিপিদের নির্দেশ
সেদিন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা আলী রায়হান। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৮ আগস্ট হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই দুই মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, রাজশাহীর জুলাই আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
৩০ মামলা, বিচার কতদূর?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে মোট ৩০টি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকটি মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অভাব, নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকের সাক্ষ্য দিতে অনীহা এবং পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহে জটিলতার কারণে তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।
আরও পড়ুন
জুলাই হত্যা মামলার বিচার এক বছরের মধ্যে শেষ করার আশা চিফ প্রসিকিউটরের
সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়েও বিচারিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধারা। তাদের অভিযোগ, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অভিযুক্তদের প্রতি এক ধরনের প্রশ্রয় তৈরি করছে এবং এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কষ্ট আরও বাড়ছে।
হতাশা-অনিশ্চয়তায় শহীদের পরিবার
সাকিব আঞ্জুমের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী আসনা খাতুন বলেন, ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাকিব আমাদের বাসায় আশ্রয় নেয়। বাসায় ঢুকেই সে এক গ্লাস পানি চেয়েছিল। পানি পান করার পরই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার শেষ মুহূর্ত আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য এখনো ভুলতে পারিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দুই বছর পার হয়ে গেলেও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার দেখতে পাইনি। যারা এ হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি শুধু সাকিব নয়, জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো প্রত্যেক শহীদের হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার চাই।
রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব আঞ্জুম। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ছেলে হারানোর শোকের পাশাপাশি বিচারহীনতার আশঙ্কাও তাড়া করছে পরিবারকে।
আরও পড়ুন
ফিরে দেখা ৫ আগস্ট / ‘বিজয়ের দিনেও’ রক্তাক্ত ছিল রাজশাহী, সন্ধ্যায় বদলে যায় দৃশ্যপট
সাকিবের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলেকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার হলে অন্তত একজন মা হিসেবে কিছুটা শান্তি পাব। দুই বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করছি। প্রতিটি দিন আমাদের কাছে কষ্টের। রাষ্ট্র যদি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হবে খুনিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা।
তার বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। আদালত, তদন্ত—সবকিছু যেন খুব ধীরগতিতে চলছে। আমাদের পরিবার কোনো প্রতিশোধ চায় না, আমরা শুধু আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই। যারা অপরাধ করেছে, তারা যেন আইনের আওতায় এসে শাস্তি পায়—এটাই এখন আমাদের একমাত্র দাবি।
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু আজও আমরা সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি না। মামলার চার্জশিট হলেও বিচারিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রত্যেক মানুষের পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।
জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, আন্দোলনে অনেকেই জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিচার বিলম্বিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ভুল বার্তা যাবে।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে যা বলছে আরএমপি
আরএমপির মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং ভিডিও ফুটেজে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই এসব মামলার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) সবসময় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি, তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি সহযোগিতা দিতে আরএমপি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন
জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসায় ছিল চাপ-বদলি ও জীবন বাঁচানোর লড়াই
রাজশাহীতে জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। রাজশাহীতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আরএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের (ক্রাইম) নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম নিয়মিতভাবে তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করছে। ইতোমধ্যে ৩০টি মামলার মধ্যে ২১টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। আরও দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। আশা করছি, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই সেগুলোর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত যেসব মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬ শতাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, কেবল তথ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও আমরা সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
বিচারক সংকট ও দীর্ঘসূত্রতায় থমকে বিচার
এদিকে বিচারক সংকটও বিচারপ্রক্রিয়ার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন মহানগর দায়রা জজের পদ শূন্য থাকায় অনেক মামলার বিচারকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে চার্জশিট জমা পড়লেও বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমানে বিচারক নিয়োগের পর ধীরে ধীরে মামলাগুলো কার্যতালিকায় আসছে। তবে বিচারজট পুরোপুরি কাটিয়ে দ্রুত রায়ে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন
ফিরে দেখা ২২ জুলাই / চারদিকে শুধু গুলি-ধোঁয়া আর মানুষে আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে সাভার
রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলী আশরাফ মাসুম বলেন, আমাদের মহানগর দায়রা জজ আদালতে বেশ কয়েকটি বিচারিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বিচারিক কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে বর্তমানে মামলাগুলোর কার্যতালিকা অনুযায়ী শুনানি গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, যেসব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলোর বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
রাজশাহীর অধিকাংশ মামলায় আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রাজশাহীর সাবেক সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আলোচিত হত্যা মামলায় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
কেএইচকে/জেআইএম