বিজ্ঞাপন
বিহারের প্রশান্ত কিশোরের জয় কেন বিজেপির জন্য একটি বড় ধাক্কা
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৪৩টি আসনের মধ্যে ২০২টি জিতে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু তার প্রায় নয় মাস পরেই বাঁকিপুর উপনির্বাচনে হারের মুখ দেখতে হচ্ছে বিজেপিকে। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন রাজ্যসভায় মনোনীত হওয়ার পর আসনটি শূন্য হয়েছিল।
এই জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আর কেউ নন, জন সুরাজ পার্টির (জেএসপি) প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর, যার দল ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একটি আসনও জিততে পারেনি। গণনায় তিনি বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহাকে পেছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে গেছেন।
বাঁকিপুর থেকে প্রশান্ত কিশোরের জয় বিজেপির জন্য মোটেও ভালো সংকেত নয়। এর পেছনের কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো।
বাঁকিপুর উপনির্বাচনে এগিয়ে প্রশান্ত কিশোর
বিহারের বাঁকিপুর উপনির্বাচনে, রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া প্রশান্ত কিশোর বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহার চেয়ে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। ৩১ রাউন্ড গণনা শেষে জেএসপি প্রধান পেয়েছেন ৬৩,২০৩ ভোট, অন্যদিকে বিজেপির প্রার্থীর ঝুলিতে গেছে ৪৪,২৫০ ভোট।
ভোট গণনা চলাকালেই জেএসপি তাদের সদর দপ্তরে উল্লাস ও স্লোগান তুলে উদযাপন শুরু করে। ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই জন সুরাজের রাজ্য সভাপতি মনোজ ভারতী বলেন, “প্রশান্ত কিশোর জনগণের কাছ থেকে ধারাবাহিক সমর্থন পেয়েছেন। আমার মনে হয় এটি জন সুরাজের জন্য এক নতুন সোনালী যুগের সূচনা।”
পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নিউজ১৮-কে কিশোরের স্ত্রী ডঃ জানহভী দাস বলেন, "আমি বাঁকিপুরের মানুষকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই... তারা এই জয়ের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন।"
বাঁকিপুর উপনির্বাচনে কিশোরের সাফল্যের কারণ
অনেকের মতে, এই জয়ের মূল কারিগর কিশোর নিজেই। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি, তবে এবার তিনি সরাসরি নির্বাচনী ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
এছাড়া মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তনের সন্ধান করছিল এবং প্রশান্ত কিশোরের মধ্যে তারা সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে। আবেগভিত্তিক ইস্যুর বদলে কিশোর শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সমস্যাগুলোর ওপর জোর দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন।
এর ফলে অনেকেই তাকে একজন "অপেক্ষাকৃত ভালো ও সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রার্থী" হিসেবে বিবেচনা করেছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেএসপি প্রতিষ্ঠাতা মহল্লা বৈঠক ও সরাসরি গণসংযোগের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি বিজেপির প্রথাগত "সামাজিক সমীকরণ" ভাঙতে সক্ষম হন এবং বিজেপির স্থানীয় ইউনিটের ভেতরের কোন্দল ও অসন্তোষের সুযোগ নেন।
কিশোরের জয় = বিজেপির জন্য বিরাট ধাক্কা
বাঁকিপুরে কিশোরের জয় বিজেপির জন্য এক বিরাট হতাশাজনক ঘটনা।
প্রথমত: বাঁকিপুর দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত। প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক অঞ্চল ও বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার পকেট সমৃদ্ধ এই আসনে ঐতিহাসিকভাবে উচ্চবর্ণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের উপস্থিতিতে বিজেপি বারবার বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে।
ইতিহাস: ১৯৯৫ সালে নিতিন নবীনের বাবা কিশোর প্রসাদ সিনহা এই আসনে জয়ের মাধ্যমে বিজেপির আধিপত্য শুরু করেন। তিনি টানা চার মেয়াদে আসনটি ধরে রাখেন। ২০০৬ সালে তার মৃত্যুর পর নিতিন নবীন উপনির্বাচনে জয়ী হন। এরপর ২০১০ সালে নতুন করে পুনর্বিন্যাস করার পরও বাঁকিপুর আসনে নিতিন নবীন ধারাবাহিকভাবে জয়ী হয়ে এসেছেন।
মর্যাদার লড়াই: গত বছরের বিহার বিধানসভা নির্বাচনেও নবীন টানা পঞ্চম মেয়াদে আরজেডি প্রার্থীকে প্রায় ৫০,০০০ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। ফলে এই আসনটি বিজেপির জন্য ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
জয়ের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্রাট চৌধুরী ফ্যাক্টর। নীতিশ কুমারের পর বিজেপির সম্রাট চৌধুরী বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই রাজ্যে প্রথম নির্বাচন। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এই উপনির্বাচনটি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চৌধুরীর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা ছিল।
এছাড়া রাজনৈতিক আবহের বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের (Gen-Z) আন্দোলনের পর এটিই ছিল প্রথম ভোটগ্রহণ। বিহারেও তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ হয়েছিল, যেখানে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে যুবসমাজের একটি অংশ বিজেপির ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছে, যা পাঞ্জাব ও গুজরাটসহ অন্যান্য রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
মধ্যপ্রদেশের উপনির্বাচনেও বিজেপির ধাক্কা
সোমবারের দিনটি বিজেপির জন্য সুখকর ছিল না, কারণ মধ্যপ্রদেশের উপনির্বাচনেও দলটি ভালো পারফর্ম করতে পারেনি।
দাতিয়া আসনে কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং বিজেপি প্রার্থীর চেয়ে ১২,০০০-এরও বেশি ভোটে জয়ের পথে রয়েছেন। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর অধীনে ২ এপ্রিল কংগ্রেস বিধায়ক রাজেন্দ্র ভারতী বরখাস্ত হওয়ার পর আসনটি শূন্য হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই পিটিআই-কে জানিয়েছেন, দাতিয়া বিধানসভা উপনির্বাচন বিজেপির জনপ্রিয়তার একটি গণভোটের মতো। এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিজেপির জন্য পুরো খবরটাই খারাপ নয়। গুজরাটের মাঞ্জালপুর আসনে বিজেপি প্রার্থী সতীশ প্যাটেল কংগ্রেসের ভিখাভাই রাবারীকে ৩০,৬৩০ ভোটে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন।
সব মিলিয়ে এই তিন উপনির্বাচন বিজেপির জন্য এক মিশ্র ও বৈপরীত্যপূর্ণ ফলাফল এনে দিয়েছে।
====
বিজেপির দুর্গে প্রশান্ত কিশোরের হাঁকি: বাঁকিপুর উপনির্বাচনে পরাজয় কেন পদ্ম শিবিরের জন্য বিরাট এক ধাক্কা?
বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র বিপুল বিজয়ের ঠিক নয় মাস পর রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল রাজনৈতিক ওলটপালট ঘটল। বিজেপির দীর্ঘকালের সবচেয়ে নিরাপদ আসন হিসেবে পরিচিত পাটনার বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিশাল জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া প্রশান্ত কিশোর। তাঁর নতুন দল `জন সুরাজ পার্টি` (জেএসপি)-র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এটি কিশোরের প্রথম প্রত্যক্ষ নির্বাচনী বিজয়।
ভোট গণনার শুরু থেকেই বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান প্রশান্ত কিশোর। চূড়ান্ত গণনায় প্রশান্ত কিশোর বিজেপির প্রার্থীকে প্রায় ১৯,০০০-এরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে এই ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করেছেন। যেখানে জাতীয় জনতা দল (আরজেডি) প্রার্থী অনেক পেছনে থেকে তৃতীয় স্থানে দৌড় শেষ করেছেন।
প্রশান্ত কিশোরের এই জয় কেবল তাঁর জন্য এক বিশাল মাইলফলক নয়, বরং বিজেপির নীতি ও নেতৃত্বের জন্য এটি এক কঠিন সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কেন এই বিজয় বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা?
১. ৩০ বছরের ‘অভেদ্য দুর্গে’ প্রথম ফাটল
বাঁকিপুর আসনটি গত প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছিল। ১৯৯৫ সালে নিতিন নবীনের বাবা কিশোর প্রসাদ সিনহা এই আসন থেকে জয়ী হয়ে বিজেপির আধিপত্যের সূচনা করেন। তাঁর প্রয়াণের পর ২০০৬ সালে উপনির্বাচন থেকে শুরু করে টানা পাঁচবার এই আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন সাবেক বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন। নিতিন নবীন সম্প্রতি রাজ্যসভায় মনোনীত হওয়ায় আসনটি খালি হয়। নিতিন নবীনের ছেড়ে দেওয়া এবং বিজেপির অন্যতম নিরাপদ নগরীয় এই আসনে হার বিজেপির দলীয় মর্যাদায় সরাসরি আঘাত হেনেছে।
২. মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর ওপর অনাস্থা প্রবাস?
নীতিশ কুমারের পর বিহারে বিজেপির সম্রাট চৌধুরী নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম কোনো নির্বাচনী পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁকিপুরের উপনির্বাচনটি ছিল বস্তুত সম্রাট চৌধুরীর সরকারের জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের ওপর জনগণের এক প্রকার "গণভোট"। সেখানে বিজেপির হেরে যাওয়া নির্দেশ করে যে, শাসকদলের নতুন নেতৃত্বের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খেয়েছে।
৩. তরুণ সমাজ ও `জেন-জি` ভোটারদের অসন্তোষ
বিজেপির এই পরাজয়ের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো তরুণ ভোটারদের মনোভাব। সর্বভারতীয় পর্যায়ে NEET প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে তরুণদের যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তার ঢেউ বিহারেও পড়েছিল। প্রশান্ত কিশোর তাঁর প্রচারে কোনো আবেগীয় ইস্যু তুলে না ধরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নাগরিক সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিজেপি তাদের ঐতিহ্যবাহী তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটব্যাংকের বড় একটি অংশ হারিয়েছে।
৪. বিরোধী শিবিরের নতুন সমীকরণ
আরজেডি-কে পেছনে ফেলে প্রশান্ত কিশোরের দল দ্বিতীয় নয়, বরং সরাসরি এক নম্বর বিকল্প হিসেবে উঠে আসায় রাজ্য রাজনীতির মোড় নতুন দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়া `জন সুরাজ` যে বিহারে বিজেপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, বাঁকিপুর তার প্রমাণ দিল।
কীভাবে মোড় ঘুরালেন প্রশান্ত কিশোর?
কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত প্রশান্ত কিশোর এবার নিজেই সরাসরি ভোটের ময়দানে নামার সাহসিকতা দেখান।
স্থানীয় গণসংযোগ: গত দুই মাস ধরে তিনি ঐতিহ্যবাহী জনসভার চেয়ে প্রতিটি মহল্লায় সরাসরি ভোটারদের ঘরে গিয়ে প্রচার ও জনসংযোগের ওপর জোর দেন।
স্থানীয় কোন্দলের সুবিধা: বিজেপির স্থানীয় ইউনিটের অন্তর্দ্বন্দ ও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কর্মী মহলে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কিশোর বিজেপির বাঁধাধরা সামাজিক সমীকরণ ভেঙে দিতে সফল হন।
বিষয়ভিত্তিক রাজনীতি: হিন্দুত্ব বা আবেগভিত্তিক প্রচারের বদলে কেবল রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরির এজেন্ডা নিয়ে সামনে আসেন তিনি।
অন্যান্য উপনির্বাচনের প্রতিক্রিয়া
সোমবার ঘোষিত অন্যান্য রাজ্যের উপনির্বাচনের ফলাফলেও বিজেপির জন্য খুব একটা স্বস্তির খবর আসেনি। মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া উপনির্বাচনেও কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং জয়ী হয়েছেন। তবে গুজরাটের মাঞ্জালপুর আসনে বিজেপি প্রার্থী সতীশ প্যাটেল জয় ছিনিয়ে এনে কিছু আশার আলো দেখিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, বিহারের বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের এই ঐতিহাসিক উত্থান আগামী দিনে গুজরাট ও পাঞ্জাব সহ অন্যান্য রাজ্যের রাজনীতিতে এবং বিজেপির ভেতরের কৌশল নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন