বিজ্ঞাপন
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় চুক্তি করে দেশের ডায়ালাইসিস সেবাকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যানডোর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস। ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সরকারি ডায়ালাইসিস মেশিনগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রেখে একচ্ছত্রভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এ বিদেশি প্রতিষ্ঠান।
সরকারি হাসপাতালের জায়গা, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও বিপরীতে কোনো বিল পরিশোধ করছে না স্যানডোর। উল্টো ডায়ালাইসিসের খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে সাধারণ রোগীদের জন্য সরকারি বরাদ্দের অর্থ লোপাট করছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিকডু ও চমেক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে স্যানডোর। নিজেদের মেশিন বসিয়ে এবং জনবল দিয়ে হাসপাতাল দুটোর পুরো ডায়ালাইসিস ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। অথচ হাসপাতাল দুটোর নিজস্ব ডায়ালাইসিস মেশিন সম্পূর্ণ অচল বা ফেলে রাখা হয়েছে শুধু ভারতীয় কোম্পানির ব্যবসার সুবিধার্থে।
আরও পড়ুন
কিডনি ডায়ালাইসিসে কমবে চিকিৎসা ব্যয় ও সংক্রমণের ঝুঁকি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ২০১৬ সালের ২৬ নভেম্বর পিপিপি প্রকল্পের আওতায় চুক্তি করে স্যানডোর। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ২৫ নভেম্বর। এ চুক্তির আওতায় নিকডু ও চমেক হাসপাতালের সেবা দিচ্ছে স্যানডোর।
চুক্তি অনুযায়ী, স্যানডোর শুধু তাদের নিজস্ব জনবল, সার্ভিস ও মেশিনের খরচ বহন করে। এর বাইরে হাসপাতালের অবকাঠামো, মূল্যবান জায়গা, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রকে কোনো অর্থ পরিশোধ করে না। অথচ রোগীদের কাছ থেকে আদায় এবং সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে সব বিল শতভাগ আদায় করে নিচ্ছে তারা।
তথ্য অনুযায়ী, শুধু নিকডুতে এক বছরের কার্যক্রমে স্যানডোরের ব্যবহারের কারণে হাসপাতালের নিজস্ব তহবিল থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৩৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি এ খরচের এক টাকাও পরিশোধ করেনি।
নভেম্বরে স্যানডোরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনে কম খরচে সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।— স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
‘কইয়ের তেলে কই ভাজা’
স্যানডোরের জালিয়াতি ও অসম চুক্তি নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘এটি একটি সম্পূর্ণ একতরফা ও বাকওয়াস চুক্তি। আমি জয়েন করার আগেই এ চুক্তি এবং প্রাথমিক লুটপাট সম্পন্ন হয়েছিল। ভারতের এ কোম্পানির শুরুতে মাত্র ১০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করার কথা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তারা ভারত থেকে যেসব ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম বা জিনিসপত্র এনেছিল, সেগুলোর ওভার-ইনভয়েসিং করে ৫ টাকার জিনিস ইনভয়েসে ৫০ টাকা দেখিয়েছে! এ প্রক্রিয়ায় শুরুতেই জালিয়াতি করেছে তারা।’
আরও পড়ুন
কিডনি রোগীদের বড় স্বস্তি, প্রতি ডায়ালাইসিসে কমবে ৮০০ টাকা
তিনি অভিযোগ করেন, “সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো, চুক্তি অনুযায়ী মূল বিনিয়োগ ভারতীয় কোম্পানির করার কথা থাকলেও, তারা বাংলাদেশে এসে এ দেশের ব্যাংক থেকেই লোন (ঋণ) নিয়েছে। অর্থাৎ, এ দেশের টাকা দিয়েই তারা ব্যবসা ফাঁদ পেতে বসেছে, যেটাকে বলে ‘কইয়ের তেলে কই ভাজা’। অথচ চুক্তিতে তাদের সবরকম একতরফা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। জায়গা দিচ্ছে সরকার, বিদ্যুৎ দিচ্ছে সরকার, সব সুবিধা দিচ্ছি আমরা, আর লাভ নিয়ে যাচ্ছে তারা।”
সিঙ্গেল ইউজের নামে ‘মাল্টিইউজ’ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সরঞ্জাম
চুক্তির অন্যতম বড় ফাঁকিবাজি ও জালিয়াতি ছিল ডায়ালাইজার ব্যবহারে। ডায়ালাইজার দুই রকম হয়— সিঙ্গেল ইউজ (একবার ব্যবহারযোগ্য) এবং মাল্টিইউজ (একাধিকবার ব্যবহারযোগ্য)। সিঙ্গেল ইউজের দাম ও মান বেশি।
আরও পড়ুন
প্রতিটি জেলা হাসপাতালে হবে কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
এ বিষয়ে সাবেক সিইও কর্নেল আব্দুস সালাম বলেন, ‘চুক্তি এবং নিয়মানুযায়ী ভালো মানের সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা খরচ বাঁচাতে এবং লভ্যাংশ বাড়াতে ‘মাল্টিইউজ’ বা বারবার ব্যবহারের পদ্ধতি বেছে নেয়। এ বিষয় নিয়ে আমি বহুবার আপত্তি তুলেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ডিজিএইচএসকে (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) বলেছিলাম চিঠি দিতে। কিন্তু ভারতীয় কোম্পানির মালিক রাজীব সিন্ধে ও তার দেশীয় এজেন্টরা ওপরমহল ম্যানেজ করে সব ধামাচাপা দিয়ে দিতো।’
নিজের দায়িত্বকালীন সময়ের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পালনকালীন একবার ভারত থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকার স্যালাইন টিউবসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম আসে। আমি নিজে সেগুলো চেক করে দেখি সবগুলোর মেয়াদ শেষ (এক্সপায়ার্ড)! আমি সরাসরি কোম্পানির মালিককে বলি, ‘তুমি এগুলো কেন দেবে?\' তারা যে কোনো উপায়ে নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস চালিয়ে দিয়ে মুনাফা লুটতে চেয়েছিল।’
চুক্তি বাস্তবায়নে দেশীয় প্রভাবশালীদের দালালি
এ একতরফা অসম চুক্তিটি সফল করতে আমাদের দেশেরই কিছু বড় বড় মহারথী, নেফ্রোলজিস্ট এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি দালালি করেছেন বলে অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এই সিইও। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন নিকডুর ডিরেক্টর, যিনি নিজে একজন নেফ্রোলজিস্ট ছিলেন এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বড় বড় নেতারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন একজন পরিচালক সরাসরি ভারতীয় কোম্পানির কাছ থেকে টাকা খেতেন। আর কোম্পানিটির লিগ্যাল সাইট ও দুই নম্বরি বিষয়গুলো দেখতেন অ্যাডভোকেট হালিম এবং মিস্টার সরকার (আমিনুল ইসলাম সরকার) নামের এক ভদ্রলোক, তিনি প্রথমদিকে স্যানডোরের পরিচালক ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি মারা গেছেন। তারা ডিজি হেলথের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে সব দুর্নীতি জায়েজ করতেন। সরকারের পক্ষে ডিজিএইচএস এবং কোম্পানির পক্ষে রাজীব সিন্ধে এতে সই করেন।’
আরও পড়ুন
১৫০০ শয্যায় উন্নীত হচ্ছে বগুড়া শজিমেক হাসপাতাল
অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে চাকরি থেকে সরানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমি যখন এ অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিই, তখন রাজীব সিন্ধে আমাকে বারবার বলতেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নাকি আমাকে সরিয়ে দিতে বলে। কারণ আমি থাকলে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগছিল। এ দেশের কর্মকর্তা ও দালালরা টাকার বিনিময়ে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছিল। তবে কোম্পানির মালিক জানতেন আমি সৎ, তাই সে একপর্যায়ে আমাকে বলেছিল— ‘ওরা যা খুশি করুক, তুমি চোখ বন্ধ রাখো।’ কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, এই করাপ্ট (দুর্নীতিবাজ) লোকদের সঙ্গে আমি কাজ করবো না এবং নিজেই পদত্যাগ করি।’
ভারতীয়দের সুবিধা, বেতন বঞ্চনায় ছিলেন বাংলাদেশিরা
মালিকপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিরোধের কথা জানিয়ে সাবেক এ সিইও বলেন, ‘একপর্যায়ে কোম্পানিটি তাদের বাংলাদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুই মাস বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। অথচ ইন্ডিয়ান যারা ছিল, তাদের ঠিকই সুবিধা দেওয়া হতো। তখন আমি নিয়ম ভেঙে রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া দৈনিক ৪৫০-৫০০ টাকার যে সরকারি ভর্তুকি ও নিজস্ব তহবিলের টাকা জমা হতো, তা ব্যাংকে পাঠানো বন্ধ করে দিই। সেই টাকা আটকে রেখে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এ দেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করি।’
আরও পড়ুন
লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন আদ্-দ্বীনের
অসম চুক্তির মাধ্যমে জিম্মি করে স্যানডোর ডায়ালাইসিস ফি জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে চলেছে। শুরুতে যে ফি ছিল দুই হাজার ৮০০ টাকা, তা দফায় দফায় বাড়িয়ে বর্তমানে তিন হাজার ৩৯৪ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রোগী নিজে দেন ৬২১ টাকা। বাকি দুই হাজার ৭৭৩ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হয়।
দেশি মেশিন চালু ও সরকারি ব্যবস্থাপনার তাগিদ
কিডনি অ্যাওয়ারনেস, মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন নামের সংগঠনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায়, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার রোগী দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছেন। এ বিশাল অসহায় জনগোষ্ঠী ডায়ালাইসিস ছাড়া সম্বলহীন। বিশেষজ্ঞ এবং ভুক্তভোগীরা মনে করেন, ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী সেবা কোনো বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া মোটেও টেকসই সমাধান নয়। নিজস্ব উদ্যোগে বা নিয়ন্ত্রণে এ সেবা দেওয়া প্রয়োজন।
কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি সর্বমোট ১৩০টি প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৬৫০টি ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
এর মধ্যে নিকডুতে স্যানডোরের ৫৯টি ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রয়েছে। এসব মেশিনের মাধ্যমে প্রতিদিন ২৪০ থেকে ২৮০ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস দেওয়া সম্ভব। তবে বর্তমানে প্রতিদিন ১১৫ থেকে ১২০ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্যানডোরের ৩১টি ডায়ালাইসিস মেশিন চালু রয়েছে। সেখানেও একই চুক্তির আওতায় রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অন্য শাখা চলতে বাধা নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির কারণে সেই টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। সরকার যদি নিজে উদ্যোগ নিয়ে দেশি প্রযুক্তি ও সরকারি পড়ে থাকা মেশিনগুলো সচল করে এবং দক্ষ ‘রেনাল নার্স ও টেকনিশিয়ান’ তৈরি করে ডায়ালাইসিস কোর্স চালু করে, তবে খরচ চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে।
একটি মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক পরিবারের কারও সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন ডায়ালাইসিস লাগলে পুরো পরিবারটি পথে বসে যায়। এ সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে এ অসম চুক্তি বাতিল করে ডায়ালাইসিস সেবাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সেবা চান রোগীরা
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা কাজী মুন্না (৩২) ২০১৮ সাল থেকে ডায়ালাইসিস নিয়ে বেঁচে আছেন। আগে গণস্বাস্থ্য ও সিকেডি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস নিতেন তিনি। ছয় বছর ধরে নিকডুতে স্যানডোরের সেন্টারে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে ডায়ালাইসিস নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে আছি। এটি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য বিপদ হবে। এমনিতেই আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হলে আমরা আরও শেষ হয়ে যাব। সরকারি হলে বলা হবে, আজ জনবল নেই, কাল ডায়ালাইজার নেই, পরশু মেশিন নষ্ট। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটাই নষ্ট করে ফেলা হবে। স্যানডোরকে না দিলে যে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হোক। তারা দক্ষভাবে সেবা দিচ্ছে। সরকার নিজে পরিচালনা করলে মানুষ সেবা পাবে না।’
শারমিন মির্জার (৫২) অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, ‘আমি সাত বছর ধরে ডায়ালাইসিস নিয়ে বেঁচে আছি। এটি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। আমরা চাই, এই সেবা চালু থাকুক। কীভাবে এটি চালু রাখা হবে, সেটি সরকার ঠিক করবে। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাবে না।’
হাজারীবাগের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন (৪০) ২০১৩ সাল থেকে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হয়। আট বছর ধরে নিকডু থেকেই ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন তিনি। জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সরকারি সেবার কথা সবাই জানে। লুটেপুটে খাবে, মানুষ কিছুই পাবে না। এই সেবা চলমান রাখতে হলে বেসরকারি উদ্যোগেই রাখা উচিত।’
চুক্তি নবায়ন না হলে সচল হবে দেশীয় মেশিন
নিকডুর আবাসিক চিকিৎসক ডা. সৈয়দ রানা কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের (নিকডুর) ১১টি ডায়ালাইসিস মেশিন আছে। কিন্তু চুক্তির ফলে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অথচ প্রতিদিন ডায়ালাইসিসের জন্য এসে রোগীরা ফিরে যাচ্ছে, আমরা সুযোগ দিতে পারছি না। এখন সরকার যদি চুক্তি নবায়ন করে, তাহলে একইভাবে আমাদের মেশিন পড়ে থাকবে। আর যদি নবায়ন না করে তবে আমরা আমাদের নিজস্ব মেশিনগুলো চালাতে পারবো।’
তিনি বলেন, ‘শুনেছি, সরকার দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডায়ালাইসিসের জন্য পিপিপি প্রকল্পের আওতায় কাজে লাগাতে পারে। এমনকি স্যানডোরের পরিবর্তে কোনো যোগ্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানকেও এ কাজটি দেওয়া হতে পারে।’
ডায়ালাইসিসের রেট বাড়ায় চাপ বাড়ছে সরকারের
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলীম উদ্দিন বলেন, ‘২০১৬ সালে এই সেবা শুরু হয়েছিল ১ হাজার ৭০০ টাকার কিছু বেশি রেটে। এরপর তারা প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে এই রেট বাড়াচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ আমাদের, পানি আমাদের- সবকিছুই আমাদের। এখন ডায়ালাইসিসের রেট ৩ হাজার ৭০০ টাকার বেশি। এভাবে রেট বাড়তে থাকলে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’
চুক্তি আর নবায়ন নয়, নিজস্ব উৎসে ডায়ালাইসিস সেবা
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ডায়ালাইসিসের বাজার দখল করে রেখেছিল। নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার এখন নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং অত্যন্ত কম খরচে সাধারণ মানুষ ডায়ালাইসিস সেবা পাবে।’
তিনি বলেন, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালু করা হচ্ছে।
যা বলছে স্যানডোর
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্যানডোর বাংলাদেশের ম্যানেজার নাজমুল হোসেন বলেন, চমেক হাসপাতাল ও নিকডুর ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনার চুক্তি নবায়নের জন্য এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন তারা। বর্তমানে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
স্যানডোর বাংলাদেশের ম্যানেজার বলেন, গত ২৪ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় চুক্তির কিছু ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দিতে বলা হয়। সে অনুযায়ী স্যানডোর সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
নাজমুলের দাবি, বর্তমানে প্রতি ডায়ালাইসিসের নির্ধারিত মূল্য তিন হাজার ৩৯৭ টাকা। নতুন প্রস্তাবে এ মূল্য প্রায় ৬০০ টাকা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি মূল্য সমন্বয়ের বার্ষিক হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুরুতে ডায়ালাইজার একাধিকবার ব্যবহার করা হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর বর্তমানে সর্বোচ্চ তিনবার ব্যবহার করা হচ্ছে।
নাজমুল হোসেন দাবি করেন, গত ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ৭ লাখ ১০ হাজারের বেশি ডায়ালাইসিস সম্পন্ন করেছে, যা এশিয়ার মধ্যে একটি রেকর্ড। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে সেবার মান বজায় রাখায় রোগীরা সন্তুষ্ট এবং ডায়ালাইসিস সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চুক্তি নবায়ন প্রয়োজন।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পে স্যানডোরের মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৬ থেকে ১৭ কোটি টাকা। এর একটি অংশ ব্যাংকঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলেও ঋণের দায় ও পরিশোধের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটিরই।
এসইউজে/এমএএইচ/এমএমএআর
বিজ্ঞাপন