বিজ্ঞাপন
বিশ্ব ফুটবল কি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে খেলার চেয়ে ব্যবসাই বড় হয়ে উঠছে? ফুটবল কি ধীরে ধীরে সমর্থকদের হাতছাড়া হয়ে করপোরেট বিনিয়োগকারীদের সম্পদে পরিণত হচ্ছে? নাকি এটি কেবল আধুনিক যুগের বাস্তবতা, যেখানে আরও বেশি অর্থ মানেই আরও বেশি উন্নয়ন?
এই প্রশ্নগুলোই এখন বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে। কারণ, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এমন একটি পরিকল্পনা সামনে এনেছেন, যা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। আর এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে সরাসরি বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা উয়েফা।
কী সেই পরিকল্পনা?ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থাটি। প্রায় ২৮.৬৮ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার মূল্যের এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ফিফার অন্যান্য প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
প্রকল্পটির সাথে যুক্ত বিনিয়োগকারীদের অন্যতম ‘থ্রাইভ ইটারনাল’ চালু করেছেন জোশুয়া কুশনার। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। ফিফা এই প্রকল্পে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের সাথে কাজ করছে।
ফিফার দাবি, নতুন প্রতিষ্ঠান হলেও ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ, আইন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ ক্যালেন্ডার কিংবা প্রতিযোগিতার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ফিফার হাতেই থাকবে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা আলাদা হলেও ফুটবলের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে না।
ইনফান্তিনোর যুক্তিইনফান্তিনোর মতে, ফিফার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তার ভাষায়, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ফুটবলের উন্নয়নের জন্য আরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে উন্নয়ন তহবিল হিসেবে সদস্য দেশগুলো যে ৮ মিলিয়ন ডলার পায়, নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেটি ২০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। পরবর্তী চক্রে তা ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
ইনফান্তিনোর বক্তব্য, এটি মূলত ধনী ও দরিদ্র ফুটবল জাতির বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ।
তাহলে আপত্তি কোথায়?সমস্যার মূল জায়গা অর্থ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা। উয়েফার আশঙ্কা, একবার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে ফুটবলের সিদ্ধান্তগুলোও করপোরেট স্বার্থের প্রভাবমুক্ত থাকবে; এমন নিশ্চয়তা নেই।
উয়েফা তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘ফুটবলের আত্মা ও শাসনব্যবস্থা কোনো বাণিজ্যিক সম্পদ নয়। বিশেষ করে যখন আর্থিকভাবে কারা লাভবান হবে সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।’
আরও কঠোর ভাষায় তারা বলেছে, ‘ফুটবল ফিফার সম্পত্তি নয় যে তারা সেটি বিক্রি করবে।’
এই বক্তব্য বিশ্ব ফুটবলে বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অতীতের অভিজ্ঞতাএটাই প্রথম নয় যে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা ইউরোপের বিরোধিতার মুখে পড়েছে। বাণিজ্যিক লাভের কথা চিন্তা করে ২০২১ সালে তিনি প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখনও উয়েফা ও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন কনমেবল তীব্র আপত্তি জানায়। বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।
অর্থাৎ ইতিহাস বলছে, ইউরোপ যদি একজোট হয়ে বিরোধিতা করে, তাহলে ফিফার জন্য বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ নয়।
কেন এত বিতর্কিত ইনফান্তিনো?২০১৬ সালে সেপ ব্লাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ফিফাকে নতুন রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। শুরুর দিকে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনও আসে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮ করা, ক্লাব বিশ্বকাপকে বিশাল আকারে সম্প্রসারণ, নতুন নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খোঁজা, ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানোয় খেলোয়াড়দের বিশ্রাম কমে যাওয়ায় সামগ্রিক ফুটবল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার মতো সমালোচনা আছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া সবশেষ বিশ্বকাপে (২০২৬) ট্রাম্পের ফোনে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ফুটবলারের লাল কার্ড প্রত্যাহারসহ রেফারিং নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিল। যার কারণে ইনফান্তিনোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সমর্থকদের একাংশ মনে করেন, ফুটবলের ঐতিহ্যের চেয়ে আয়ের বিষয়টি এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই বিশেষ বিশেষ জায়গায় নিরপেক্ষ থাকতে পারছে না ফিফা।
ট্রাম্প-কুশনার সংযোগইনফান্তিনোর নতুন পরিকল্পনাকে ঘিরে আরেকটি বিতর্কের কারণ হলো সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের রাজনৈতিক সংযোগ। জশুয়া কুশনার হচ্ছেন জ্যারেড কুশনারের ভাই। আর জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সম্পর্ক মার্কিন রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি।
অর্থ বনাম ঐতিহ্যবর্তমান বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই। বিশ্বকাপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া সম্পদগুলোর একটি। সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকেই ফিফা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এমন পরিস্থিতিতে আরও বেশি আয়ের চেষ্টা কি অস্বাভাবিক? অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, না।
তাদের মতে, বাড়তি অর্থ মানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ। অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি, সীমাহীন বাণিজ্যিকীকরণ শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্বকীয়তা নষ্ট করবে।
যখন বিনিয়োগকারীরা লাভের হিসাব করবে, তখন ম্যাচের সূচি, টুর্নামেন্টের সংখ্যা, খেলোয়াড়দের ওপর চাপ-সবকিছুতেই অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে। এমনকি বাণিজ্যিক স্বার্থের কথা চিন্তা করে কোনো বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও দেখা যেতে পারে।
বিশ্বকাপ কি সত্যিই ঝুঁকিতে?ফিফার নতুন পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে ২১১টি সদস্য দেশের অনুমোদন লাগবে। ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশ একসঙ্গে বিরোধিতা করলে সেই অনুমোদন পাওয়া সহজ হবে না।
তাছাড়া বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী লিগ, সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব এবং বিশ্বের অধিকাংশ তারকা ফুটবলারই ইউরোপে খেলেন। ফলে উয়েফার অবস্থানকে উপেক্ষা করার সুযোগ খুবই সীমিত।
ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন পথে?জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেকে বিশ্ব ফুটবলের আধুনিক রূপকার হিসেবে দেখতে চান। তার সমর্থকদের মতে, তিনি ফিফার আয় বাড়িয়েছেন, বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক করেছেন এবং ছোট দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
কিন্তু সমালোচকদের চোখে তিনি এমন একজন প্রশাসক, যার সময়ে ফুটবল ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবল কি ধ্বংস হবে নাকি উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে-এখনও হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি। তবে এটুকু নিশ্চিত যে তার নেতৃত্বে ফুটবল এমন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে; যেখানে অর্থ, রাজনীতি এবং খেলার ঐতিহ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এমএমআর
বিজ্ঞাপন