সারাদেশ

দূর শহরে আপনি, বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা—দূরত্ব ঘোচানোর যত উপায়

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
4 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
চাকরির নতুন সুযোগ। নতুন শহর। নতুন জীবন। কিন্তু ব্যাগ গোছাতে গেলেই মনটা কেমন ভার হয়ে আসে। কারণ, নিজের শহর ছেড়ে যেতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাড়িতে থেকে যাচ্ছেন সেই দুজন মানুষ—বৃদ্ধ বাবা-মা। তাঁদেরও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁরা রাজি নন। এই বাড়ি, এই পাড়া, পরিচিত মানুষ আর বছরের পর বছর গড়ে ওঠা জীবন ছেড়ে নতুন শহরে গিয়ে মানিয়ে নেওয়া তাঁদের কাছে সহজ নয়। আপনি জানেন, এই বয়সে শিকড় উপড়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে হয়তো ভালো থাকবেন না তাঁরা। তাই আপনি চলে যাবেন। আর রেখে যাবেন একরাশ চিন্তা—হঠাৎ অসুস্থ হলে কী হবে? রাতে কোনো বিপদ হলে কে ছুটে যাবে? বাজার করবেন কে? হাসপাতালে নিয়ে যাবে কে? কিংবা নিছক মন খারাপ হলে পাশে বসবে কে? দুশ্চিন্তা থাকবেই। তবে দূরত্ব মানেই অসহায়ত্ব নয়। একটু পরিকল্পনা করে এগোলে দূরে থেকেও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত করা যায়। প্রথমেই তৈরি করুন ‘জরুরি পরিকল্পনা’ আপনি শহর ছাড়ার আগেই বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন। তাঁদের নিয়মিত ওষুধ, পুরোনো প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার ইতিহাস গুছিয়ে একটি ফাইলে রাখুন। বাড়ির এমন জায়গায় আপনার ফোন নম্বর, কাছের আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধুর নম্বর লিখে রাখুন, যেখানে সহজেই চোখে পড়ে। জরুরি সময়ে ফোন নম্বর খুঁজতে যেন কাউকে হিমশিম খেতে না হয়। সম্ভব হলে কাছাকাছি কোনো নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা প্রয়োজনে বাড়িতে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে আপনার দুশ্চিন্তাও কমবে। আর সবচেয়ে জরুরি—ফোনে শুধু ‘খেয়েছেন?’ বা ‘ওষুধ খেয়েছেন?’ বলে দায়িত্ব শেষ করবেন না। তাঁদের সঙ্গে একটু গল্প করুন। দিনের কথা শুনুন। কারণ অনেক সময় একজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের কণ্ঠটাই সবচেয়ে বড় আশ্বাস। বাড়ির কাজের জন্য চাই বিশ্বস্ত একজন বাবা-মা সুস্থ থাকলেও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের কাজ আগের মতো সহজ থাকে না। তাই একজন বিশ্বস্ত গৃহকর্মী বা সহকারী রাখার কথা ভাবুন। সারাদিনের জন্য কাউকে রাখা সম্ভব না হলেও দিনে এক-দুবার আসেন—এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, বাজার কিংবা প্রয়োজনের সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো কাজ তিনি সামলাতে পারেন। তবে শুধু কাউকে নিয়োগ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাঁর পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করে নিন। বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ওই ব্যক্তির সঙ্গেও আপনার যোগাযোগ থাকা উচিত। আপনার বাবা-মা থাকবেন তদারকিতে, আর দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রমের বড় অংশটা সামলাবেন সহকারী। বাড়িটাকেও বানান নিরাপদ বৃদ্ধদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পড়ে গিয়ে চোট পাওয়া। তাই আপনি চলে যাওয়ার আগে একবার নতুন চোখে পুরো বাড়িটা দেখুন। কোথাও কার্পেটের ভাঁজ? পথে পড়ে থাকা তার? হোঁচট খাওয়ার মতো আসবাব? ধারালো টেবিলের কোণা? সবকিছু ঠিক করুন। বিশেষ করে বাথরুমে অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করুন। রান্নাঘর ও অন্যান্য ভেজা জায়গাতেও একই ব্যবস্থা রাখা ভালো। বাবা-মা বাইরে গেলে কীভাবে যাবেন, সেটিও আগে ঠিক করে রাখুন। পরিচিত গাড়ি, বিশ্বস্ত চালক কিংবা নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যেতে পারে। শরীরের পাশাপাশি মনটাকেও দেখুন একসময় যে বাবা আপনাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, যে মা আপনার ফেরার অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন—একদিন তাঁদেরই অপেক্ষা করতে হয় আপনার একটি ফোনকলের জন্য। সন্তান দূরে চলে গেলে এই শূন্যতাটা অনেক সময় প্রবীণদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। তাই নিয়মিত ভিডিও কল করুন। সম্ভব হলে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলার অভ্যাস করুন। কখনও দীর্ঘ কথা বলার সময় না থাকলেও কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথোপকথন তাঁদের দিনটা ভালো করে দিতে পারে। বই পড়ার অভ্যাস থাকলে তাঁদের পছন্দের বই এনে দিন। সিনেমা, নাটক বা ওটিটি কনটেন্টের ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রযুক্তিতে আগ্রহ থাকলে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সাহায্য করুন। চলাফেরায় সমস্যা না থাকলে কাছের লাইব্রেরি, ক্লাব বা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহ দিন। মাঝেমধ্যে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা তাঁদের পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে ছোট্ট আড্ডার আয়োজনও হতে পারে। কারণ, বৃদ্ধ বয়সে ওষুধের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গও এক ধরনের প্রয়োজন। ব্যাংক-বিলের কাজ সহজ করে দিন বাবা-মায়ের পেনশন, ব্যাংক, বিল পরিশোধ কিংবা অনলাইন কেনাকাটার মতো কাজগুলো যতটা সম্ভব দূর থেকেই সামলে দিন। যেসব কাজের জন্য তাঁদের সশরীরে যেতে হবে, সেখানে বিশ্বস্ত আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত কাউকে সঙ্গে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। তাঁরা যদি নিজেরাই ডিজিটাল পেমেন্ট করতে চান, তাহলে প্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যবহারের পদ্ধতি শেখাতে পারেন। তবে তার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে বুঝিয়ে দিন। সবচেয়ে জরুরি—সাইবার নিরাপত্তা বয়স বাড়লেও প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকেন না অনেক প্রবীণ। স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন ব্যাংকিং—সবই এখন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আর এখানেই লুকিয়ে থাকে বিপদ। কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে কখনোই ওটিপি, কার্ডের পিন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য বা ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া যাবে না—বিষয়টি বারবার মনে করিয়ে দিন। সন্দেহজনক ফোনকল, লিংক বা মেসেজে সাড়া না দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়েও সতর্ক করুন। দূরে থাকুন, কিন্তু দূরে সরে যাবেন না চাকরির প্রয়োজনে আপনাকে হয়তো অন্য শহরে থাকতেই হবে। প্রতিদিন বাবা-মায়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। কিন্তু যত্ন নেওয়ার জন্য সবসময় একই ছাদের নিচে থাকা জরুরি নয়। একটি ফোনকল, একটি ভিডিও কল, ওষুধের খোঁজ নেওয়া, বাজার পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থ হলে দ্রুত কাউকে পাঠানো—এই ছোট ছোট কাজগুলোই দূরত্ব অনেকটা কমিয়ে দেয়। তাই নতুন শহরে যাওয়ার আগে শুধু নিজের ব্যাগটাই গুছিয়ে নেবেন না। বাবা-মায়ের জন্যও গুছিয়ে রাখুন একটি নিরাপদ ব্যবস্থা। কারণ, আপনি যত দূরেই থাকুন না কেন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে আপনার উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—তাঁরা যেন জানেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে আপনাকে পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>