বিজ্ঞাপন
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবশিষ্ট জবানবন্দি দিয়েছেন সাক্ষী মো. জাকির হোসেন। জবানবন্দিতে মেনন ও কামরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন জাকির হোসেন। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করা হয়। এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি আংশিক জবানবন্দি দেন।
এ মামলায় রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে মেনন ও কামরুল নানা উসকানি দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা দুজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।
‘ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাই’
জবানবন্দিতে জাকির হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসা থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেটে তার পরিচিত ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ এবং আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে একজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন বলে জানতে পারেন। বন্ধু খলিলুর রহমানের সঙ্গে থাকা অবস্থায় তিনি জানতে পারেন, ওই দিন জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় ৬-৭ জন শহীদ হন। তাদের মধ্যে ১১ বছরের শিশু তামিম শিকদারও ছিল।
‘আমি নিজেও সেখানে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি’—জবানবন্দিতে বলেন জাকির।
‘মেনন ও কামরুল ১৪ দলের বৈঠকে ছিলেন’
জাকির হোসেন বলেন, ১৪ দলের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে কারফিউ জারি ও গুলি করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। সেখানে তার পাশে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন উপস্থিত ছিলেন। অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামও ১৪ দলের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ২০ জুলাই সকাল থেকে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে। তারা আন্দোলনকারী ছাত্র-শিক্ষার্থীদের মারধর করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী ছাত্রদের বই-পুস্তক পুড়িয়ে দেয় এবং টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার বাসাতেও তল্লাশি চালানো হয় বলে জানান জাকির।
‘বারবার হামলার শিকার হয়েছি’
জাকির হোসেন বলেন, একপর্যায়ে তাকে খুঁজতে থাকে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২৪ জুলাই তিনি পালিয়ে চট্টগ্রাম চলে যান। তার গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়াতেও পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা চালালে ২৬ জুলাই তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন।
তিনি বলেন, ২ আগস্ট রাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন তার আজিমপুরের বাড়ি ঘেরাও করে। তখন বাড়ির ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে পালিয়ে যান তিনি। ৩ আগস্ট ভোরে আবার চট্টগ্রামে চলে যান। ওইদিন রাতে সাতকানিয়ার বাড়িতে তার ওপর হামলা চালানো হয়।
‘আমি আন্দোলনে ছাত্রদের সহায়তা করতাম বলে আমার ওপর বারবার হামলা করা হয়’—বলেন জাকির।
‘গুলিতে পঙ্গু হয়ে গেছে নূরুল্লাহ’
৪ আগস্ট চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে জাকির বলেন, সেখানে তাদের সঙ্গে চট্টগ্রামের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে তার পাশে থাকা আন্দোলনকারী ছাত্র, চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র একেএম নূরুল্লাহ পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন। তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য গুলি লাগে। গুলিগুলো ছিল বড় বড়। একটি গুলি তার রানে লাগলে মাংস ছিঁড়ে যায়।
জাকির বলেন, ছেলেটি ছিল হতদরিদ্র। তিনি তার চিকিৎসায় সহায়তা করেন। বর্তমানে নূরুল্লাহ পঙ্গু হয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, ওই সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র দেখতে পান। তাদের অনেককে তিনি চিনতে পারেন। ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা, বকশিরহাট, চট্টগ্রাম কোর্ট এলাকা, নিউমার্কেট, ষোলশহর ও ওয়াসা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের গুলিতে হাজার হাজার আন্দোলনকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ী আহত ও নিহত হন। তাদের মধ্যে তার তিন কর্মচারীর শরীরেও ছররা গুলি লাগে।
৪ আগস্ট রাতে ৮-৯ বার গাড়ি পরিবর্তন করে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন বলেও জানান জাকির।
‘বাড্ডায় বন্ধুর শরীরে শত শত গুলির চিহ্ন দেখি’
৫ আগস্ট গণভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে জাকির বলেন, তিনি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের নিয়ে আজিমপুর-নিউমার্কেট এলাকা থেকে বেলা ১১টার পর গণভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
‘ওই দিন সকালে চাঁনখারপুল, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও গুলি বর্ষণ করা হয়। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হয়। আমরা রাস্তায় পদে পদে বাধার সম্মুখীন হই। একপর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে শুনতে পাই, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা গণভবনে আনন্দ মিছিলে যোগ দিই’—জবানবন্দিতে বলেন তিনি।
জাকির আরও বলেন, দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে বন্ধু খলিলুর রহমান ফোন করে জানান, তারা রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় রয়েছেন। পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের ঘেরাও করে রেখেছে। যে কোনো সময় তাদের মেরে ফেলা হতে পারে। এ সময় তাদের উদ্ধারে সহায়তা চান খলিলুর।
তিনি বলেন, বিকেল ৫টার দিকে বাড্ডায় পৌঁছাই। সেখানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিপরীতে একটি গলির মধ্যে বন্ধু খলিলুর রহমানকে খুঁজে পাই। তার শরীরে সাত শতাধিক গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তাকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে রাখেন। পরে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
জাকির জানান, সরকারের সহায়তায় খলিলুর রহমান গত পাঁচ মাস থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে দেশে আছেন। তিনি পঙ্গু হয়ে গেছেন।
সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি
জবানবন্দিতে জাকির হোসেন বলেন, আল জাজিরা, বিবিসিসহ দেশীয় গণমাধ্যমের সূত্রে তিনি জানতে পারেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের ‘কু-পরামর্শে’ আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা ও আহত করা হয়।
তিনি দাবি করেন, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শদাতা ও হত্যার নির্দেশদাতা ছিলেন।
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে মেনন ও কামরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন সাক্ষী মো. জাকির হোসেন।
এফএইচ/বিএ
বিজ্ঞাপন