বিজ্ঞাপন
রান্না করতে গিয়ে খাবার একটু পুড়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কখনো তরকারি কড়াইয়ের তলায় লেগে যায়, কখনো ভাত গরম করতে গিয়ে নিচের অংশ কালো হয়ে যায়। আবার টোস্ট বা পাউরুটি সেঁকতে গিয়েও অসাবধানতায় পুড়ে যেতে পারে।
অনেকেই পোড়া অংশটুকু সরিয়ে বাকি খাবার খেয়ে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়মিত এমন পোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ-
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় রান্না বা অতিরিক্ত ঝলসে গেলে তার রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে কিছু পুষ্টিগুণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু যৌগ তৈরি হতে পারে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
উচ্চ তাপে রান্নার সময় খাবারের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে
পোড়া খাবার মানেই কি ক্যানসারের কারণ?
অঙ্কোলজিস্ট (ক্যানসারের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপক) চিকিৎসকের মতে, পোড়া খাবারের একটি ছোট অংশ খেয়ে ফেললেই ক্যানসার হবে-এমন ধারণা ঠিক নয়। মাঝে মধ্যে সামান্য পোড়া খাবার খাওয়া আর দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পোড়া খাবার খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তবে নিয়মিত অতিরিক্ত পোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাসকে একেবারে নিরাপদও বলা যায় না। শর্করাজাতীয় খাবার যেমন আলু, পাউরুটি বা অন্যান্য স্টার্চযুক্ত খাবার খুব বেশি অতিরিক্ত পুড়ে গেলে অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে মাংস বেশি তাপে ঝলসানো বা পুড়িয়ে ফেললে হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইন এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন -এর মতো যৌগ তৈরি হতে পারে। এসব যৌগে শরীরের প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসরের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বারবিকিউ বা গ্রিলের মাংস কি নিরাপদ?
বারবিকিউ বা গ্রিল করার সময় মাংসের বাইরের অংশ সরাসরি উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসে। অতিরিক্ত উচ্চ আঁচে মাংস ঝলসালে হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইন (এইচসিএ) তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাংসের ওপরিভাগ যত বেশি সময় ধরে তীব্র তাপে থাকে, এসব যৌগ তৈরির সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।
এদিকে মাংসের চর্বি গলে আগুনের ওপর পড়লে ধোঁয়া তৈরি হয়। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে তৈরি হওয়া পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (পিএএইচ) মাংসের গায়ে জমতে পারে। এই ধরনের যৌগই অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরে গেলে ডিএনএ ক্ষতি করতে পারে। তাই মাংস যত বেশি ঝলসে কালো বা পোড়া হয়ে যায়, ততই এসব ক্ষতিকর যৌগের উপস্থিতির আশঙ্কা বাড়ে। পোড়া বা কয়লার মতো কালো অংশ এড়িয়ে চলাই ভালো।
তবে শুধু মাংস নয়, গ্রিল করা শাকসবজির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শাকসবজিতে মাংসের মতো এইচসিএ তৈরি হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত ধোঁয়া বা আগুনের সরাসরি সংস্পর্শে থাকলে পিএএইচ সহ কিছু ক্ষতিকর পদার্থ সবজির বাইরের অংশেও জমতে পারে। তাই গ্রিল করার সময় অতিরিক্ত পোড়ানো ও ধোঁয়ার সংস্পর্শ কমিয়ে আনা উচিত।
কোন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে?
চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত অতিরিক্ত পোড়া মাংস খাওয়ার সঙ্গে বৃহদান্ত্র ও মলাশয়, অগ্ন্যাশয় এবং প্রস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। শরীরে নিয়মিত অ্যাক্রিলামাইড প্রবেশ করলে ডিম্বাশয় ও জরায়ুর ভেতরের আবরণে হওয়া ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শুধু ক্যানসার নয়, আরও ঝুঁকি
অতিরিক্ত পোড়া খাবার নিয়ে আলোচনার বড় অংশ ক্যানসারকে ঘিরে হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত তাপে তৈরি খাবার খাওয়ার অভ্যাস সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের মানও খারাপ করতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত তেল, লবণ ও পোড়া মাংস নিয়মিত খেলে হৃদ্স্বাস্থ্য ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
খাবার পুড়ে গেলে যা করবেন
খাবারের সামান্য অংশ পুড়ে গেলে কালো বা পোড়া অংশটি বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়া যেতে পারে। তবে খাবারের বড় অংশ কালো হয়ে গেলে বা পোড়া গন্ধ ও স্বাদ তীব্র হলে সেটি না খাওয়াই ভালো।
আরও পড়ুন
সুস্থ থাকতে রান্নায় কোন তেল বেছে নেবেন?
যেভাবে রান্না করে খাবার খাওয়া উচিত
রান্নার সময় মাঝারি আঁচ ব্যবহার করা, খাবার নিয়মিত নেড়ে দেওয়া এবং অতিরিক্ত সময় রান্না না করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। মাংস গ্রিল বা বারবিকিউ করার ক্ষেত্রে সরাসরি আগুনের সংস্পর্শ কমানো এবং অতিরিক্ত ঝলসে যাওয়া অংশ এড়িয়ে চলা উচিত।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্যকর হয়েও ঘুম কেড়ে নিতে পারে যেসব খাবার
মাঝেমধ্যে খাবার সামান্য পুড়ে যাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বরং দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত পোড়া খাবার কমানো, বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতি বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ইটিংওয়েল, এনডিটিভি ফুড, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন
এসএকেওয়াই
বিজ্ঞাপন