বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই সম্প্রতি চোখে পড়ছে এক ব্যক্তির নানান ভিডিও। ওয়াজের মঞ্চে তার কথা বলার ধরন, কণ্ঠের সঙ্গে অদ্ভুত প্রতিধ্বনির মতো শব্দ আর সেই শব্দের পুনরাবৃত্তি নিয়েই তৈরি হয়েছে নানা মিম ও ভিডিও। নেটদুনিয়ায় তাই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘ইকো হুজুর’ নামে। ২০২৬ সালের আগস্টে তাকে নিয়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে একাধিক ভিডিও ও পোস্টও ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘ইকো’ বলতে এখানে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? এটি কি ওই বক্তার নামের অংশ? নাকি তার গলার কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য? নাকি মাইকের কারসাজি? আসলে ‘ইকো’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শব্দবিজ্ঞানের বেশ মজার একটি বিষয়।
ইকো মানে কী?
ইংরেজি ‘Echo’ শব্দের বাংলা অর্থ প্রতিধ্বনি। কোনো শব্দ উৎপন্ন হওয়ার পর সেটি কোনো শক্ত ও বড় পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে প্রতিফলিত হয়ে আবার শ্রোতার কানে ফিরে এলে এবং মূল শব্দের পর আলাদা করে শোনা গেলে তাকে ইকো বা প্রতিধ্বনি বলা হয়। পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে জোরে চিৎকার করলে কিছুক্ষণ পর একই শব্দ আবার শোনা যায় এটাই সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।
শব্দবিজ্ঞানের দিক থেকে বিষয়টি বেশ সরল। মানুষ কথা বললে শব্দতরঙ্গ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সামনে দেয়াল, পাহাড়, ভবন বা অন্য কোনো শক্ত পৃষ্ঠ থাকলে সেই তরঙ্গের একটি অংশ প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। প্রতিফলিত শব্দটি যদি যথেষ্ট সময় পরে কানে পৌঁছায়, মস্তিষ্ক মূল শব্দ ও ফিরে আসা শব্দকে আলাদা হিসেবে শনাক্ত করতে পারে। তখনই আমরা ইকো শুনি।
আরও পড়ুন
গোপাল ভাঁড় দেখতে দেখতে ভাত খাওয়ার ট্রেন্ড কীভাবে এলো?
কতটা দূরে হলে ইকো শোনা যায়?
এখানেই রয়েছে মজার হিসাব। এনসিইআরটি-এর বিজ্ঞান শিক্ষাসামগ্রী অনুযায়ী, মানুষের শ্রবণ অনুভূতির স্থায়িত্ব প্রায় ০.১ সেকেন্ড। আলাদা ইকো হিসেবে শুনতে মূল শব্দ ও প্রতিফলিত শব্দের মধ্যে অন্তত প্রায় ০.১ সেকেন্ডের ব্যবধান প্রয়োজন। বাতাসে শব্দের গতি প্রায় ৩৪৪ মিটার/সেকেন্ড ধরলে শব্দকে সামনে গিয়ে আবার ফিরে আসার জন্য মোট প্রায় ৩৪.৪ মিটার পথ অতিক্রম করতে হয়।
অর্থাৎ প্রতিফলক পৃষ্ঠটি শব্দের উৎস থেকে প্রায় ১৭.২ মিটার বা তার বেশি দূরে হলে স্পষ্ট ইকো শোনা যেতে পারে। তবে বাস্তবে ইকো শোনার বিষয়টি শুধু দূরত্বের ওপর নির্ভর করে না। দেয়াল বা পৃষ্ঠ কতটা শক্ত, তার আকার কেমন এবং ঘরের আকৃতি কেমন এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে ‘ইকো হুজুরের’ ব্যাপারটা কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, ‘ইকো হুজুর’ নামটি মূলত তার ওয়াজের সময় মাইকের শব্দের প্রতিধ্বনি বা ইকোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিওর বর্ণনায় বলা হয়েছে, ওয়াজের মাঠে মাইকে সাউন্ড না পাওয়ার পর ইকো বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ঘটনাটি আলোচনায় আসে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি ভিডিওতে যে শব্দকে সাধারণভাবে ‘ইকো’ বলা হচ্ছে, সেটি সবসময় পদার্থবিজ্ঞানের অর্থে ‘স্পষ্ট প্রতিধ্বনি’ নাও হতে পারে। অনেক সময় মাইক্রোফোন, স্পিকার, মঞ্চের অবস্থান এবং আশপাশের দেয়াল বা অন্যান্য প্রতিফলক পৃষ্ঠের কারণে শব্দের রিভার্বারেশন বা প্রতিধ্বনিময় আবহ তৈরি হয়।
প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট শুর-এর অডিওবিষয়ক ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, প্রতিফলিত শব্দ যথেষ্ট বিলম্বে ফিরে এলে সেটি স্বতন্ত্র ইকো হিসেবে শোনা যায়। আর একাধিক দ্রুত প্রতিফলন একসঙ্গে এলে তা রিভার্বারেশনের মতো শোনে।
ইকো আর রিভার্বারেশন এক নয়
দুটিকে আমরা প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করলেও অডিও প্রযুক্তিতে এগুলো আলাদা। ধরুন, একটি খালি বড় ঘরে দাঁড়িয়ে আপনি কথা বললেন। দেয়াল থেকে শব্দ বারবার প্রতিফলিত হয়ে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কানে ফিরলে কথার শেষে শব্দ কিছুটা টেনে থাকার মতো অনুভূতি হবে। এটি রিভার্বারেশন।
অন্যদিকে, পাহাড়ের সামনে ‘হ্যালো’ বলার পর একটু বিরতি দিয়ে আবার ‘হ্যালো’ শোনা গেলে সেটি স্পষ্ট ইকো। শুর-এর তথ্য অনুযায়ী, ইকো ও রিভার্বারেশন-দুটিই শব্দের প্রতিফলনের ফল হলেও তাদের শ্রবণ অভিজ্ঞতা এক নয়।
আরও পড়ুন
রাজা-বাদশাহরা একসময় যেটা দিয়ে হাত মুছতেন, সেটাই এখন জনপ্রিয় খাবার!
মাইকের ‘ইকো’ এর আবার অন্য অর্থ আছে
আরেকটি বিষয় আছে-ফিডব্যাক। মাইক্রোফোনে ধরা শব্দ স্পিকারে বের হয়ে আবার সেই মাইক্রোফোনে ঢুকে বারবার অ্যাম্পলিফাই হলে তীক্ষ্ণ ‘হুইইই’ বা বাঁশির মতো শব্দ তৈরি হতে পারে। এটিকে অডিও প্রযুক্তিতে ফিডব্যাক বলা হয়। এটি ইকো নয়। মাইক্রোফোন ও স্পিকারের অবস্থান, শব্দের মাত্রা, ঘরের অ্যাকুস্টিকসসহ বিভিন্ন কারণে ফিডব্যাক তৈরি হতে পারে।অর্থাৎ ‘ইকো’, ‘রিভার্বারেশন’ ও ‘ফিডব্যাক’ তিনটি কাছাকাছি মনে হলেও একই জিনিস নয়।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন