জাতীয়

গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: পুলিশের গল্পের সঙ্গে বাস্তবের মিল কতটুকু?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
5 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং কিশোর ছেলে প্রিয়মের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি: আসলে কী ঘটেছিল সেই রাতে? পুলিশ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেই বয়ান অনুযায়ী, স্থানীয় দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পাশের নির্মাণাধীন ভবন হয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি তাঁদের দেখে বাধা দিলে পরিচয় ফাঁসের আশঙ্কায় তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী ও সন্তানরা ছাদে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। ঘরে থাকা ঘুমন্ত কিশোরকেও হত্যা করা হয়। এরপর ঘটনাটিকে ডাকাতি বলে চালাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা, স্বর্ণালংকার নেওয়া এবং কিছু সময় বাড়িতে থেকে গোসল, শসা-খেজুর খাওয়া ও ইয়াবা সেবনের কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্যের পক্ষে কিছু আলামতের কথাও সামনে এসেছে। দুই তরুণ গ্রেপ্তার হয়েছেন, স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে এবং তাঁরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তদন্তের দায়িত্ব কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবিতে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, অধিকতর স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্যই এই পরিবর্তন। প্রথম প্রশ্ন, শুরুতে ডাকাতি, পরে ইয়াবা—গল্প বদলাল কেন? লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ প্রাথমিকভাবে ডাকাতির সম্ভাবনার কথা বলেছিল। পরদিন তদন্তের নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু জানতে হবে, কোন আলামতের ভিত্তিতে এত দ্রুত মোটিভ বদলানো হলো? যদি ডাকাতি উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়েছিল কেন? পুলিশ বলছে, হত্যাকারীরা স্বর্ণ নিয়ে গিয়েছিল এবং তা উদ্ধারও হয়েছে। তাহলে সেটি কি ডাকাতির অংশ, নাকি হত্যার পর তদন্ত বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো দৃশ্য? দ্বিতীয় প্রশ্ন, ইয়াবা খেতে অন্যের ছাদেই কেন? পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, দুই তরুণ পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে গিয়ে মাদক সেবন করছিলেন। কিন্তু কেউ গোপনে ইয়াবা সেবন করতে চাইলে এমন একটি পরিবারের ছাদ বেছে নেবেন কেন, যেখানে বাড়ির লোকজন যেকোনো সময় উঠে আসতে পারেন? গণপতি দেখে ফেলেছিলেন—এই ব্যাখ্যা সত্য হলেও পরের প্রশ্ন আরও কঠিন: শুধু দেখে ফেলার কারণে কেন পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে? গণপতিকে হত্যার পরও তো পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। পরিচয় ফাঁসের ভয় যদি মোটিভ হয়, তবে স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে কেন এবং কোন ক্রমে হত্যা করা হলো, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ দরকার। বিশেষ করে কিশোর প্রিয়মের হত্যার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় প্রশ্ন, দুই তরুণ কি সত্যিই একাই চারজনকে হত্যা করেছেন? আসামিদের স্বজনেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস এবং মুগ্ধের মা বলেছেন, দুজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত। কারণ চারজনকে হত্যা, ঘর তল্লাশি, স্বর্ণ নেওয়া, আলামত নষ্টের চেষ্টা, গোসল, খাবার খাওয়া, ইয়াবা সেবন এবং পরে বেরিয়ে যাওয়ার পুরো ঘটনাপ্রবাহের একটি নির্ভুল টাইমলাইন দরকার। চতুর্থ প্রশ্ন, আগামী কি ভোর ৫টা ৫০ মিনিটেও জীবিত ছিলেন? দাবি করা হয়েছে, আগামী ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে ফেসবুকে লিখেছিলেন যে বাড়িতে সারারাত বিদ্যুৎ ছিল না এবং তিনি সারারাত জেগেছিলেন। দাবি সত্য হলে পুলিশের সময়রেখায় বড় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কিন্তু পোস্টটির প্রকৃত সময়, ডিভাইস, লগইন তথ্য ও মেটাডেটা পরীক্ষা করা দরকার। পোস্ট সত্য হলে সময়রেখা পুনর্গঠন করতে হবে; ভুয়া হলে পুলিশ প্রমাণসহ সেটিও জানাক। পঞ্চম প্রশ্ন, ঘটনাস্থলের আলামত কি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা হয়েছে? পুলিশ ছাদে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, কামড়ানো শসা, খেজুরের বিচি এবং পোড়ানো সোনার চুড়ির আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে। ইয়াবা ব্যবহারের সরঞ্জামে কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ আছে? স্বর্ণালংকারে আসামিদের কোনো ফরেনসিক চিহ্ন পাওয়া গেছে কি? ঘটনাস্থলের আলামত তাঁদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে মেলানো হয়েছে কি না, সেটিই মামলার শক্তি নির্ধারণ করবে। ষষ্ঠ প্রশ্ন, আটক ও গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও কি পুরোপুরি পরিষ্কার? পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরে অভিযান চালিয়ে দুই তরুণকে আটক করা হয়। আবার আসামিপক্ষের পরিবার থেকে ভিন্ন বর্ণনা এসেছে। সিসিটিভি, মোবাইল লোকেশন, কল রেকর্ড ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য দিয়ে তাঁদের অবস্থান যাচাই করা দরকার। সপ্তম প্রশ্ন, একই শার্টের অভিযোগের নিষ্পত্তি কী? সিদ্ধার্থের পরনে থাকা শার্টের সঙ্গে রংপুর ডিবির কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর শার্টের মিল রয়েছে বলে দাবি উঠেছে। কর্মকর্তা বিষয়টিকে কাকতালীয় বলেছেন। তাহলে সহজ সমাধান হলো, শার্ট দুটির উৎস, ক্রয়, ব্র্যান্ড ও সময় যাচাই করা। অষ্টম প্রশ্ন, ময়নাতদন্ত আর পুলিশের বয়ান কি পুরোপুরি মেলে? বিভিন্ন প্রতিবেদনে পুলিশি বর্ণনা ও ময়নাতদন্তসংক্রান্ত তথ্যের কিছু অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চোয়াল ভাঙার মতো আঘাতের তথ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এখানে নিয়ম পরিষ্কার: পুলিশের অনুমান নয়, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক বিজ্ঞানই চূড়ান্ত ভিত্তি। মৃত্যুর সময়, মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন ও ক্রম যদি পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে না মেলে, তাহলে পুলিশের বয়ান সংশোধন করতে হবে; ময়নাতদন্তকে গল্পের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যাবে না। নবম প্রশ্ন, ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি কি সব প্রশ্নের উত্তর? দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু স্বীকারোক্তি থাকলেই তদন্ত শেষ হয় না। জবানবন্দির সঙ্গে বস্তুগত প্রমাণের মিল থাকতে হবে। তারা কোন পথ দিয়ে ছাদে উঠেছে, কোথায় কী ফেলেছে, কখন কে কোথায় ছিল—এসব তথ্য সিসিটিভি, ফোন রেকর্ড, উদ্ধার হওয়া আলামত ও অন্যান্য প্রমাণে সমর্থিত হতে হবে। স্বীকারোক্তি তদন্তের একটি অংশ, পুরো তদন্তের বিকল্প নয়। দশম প্রশ্ন, তদন্তের দায়িত্ব ডিবিতে গেল কেন? ২৪ আগস্ট মামলার তদন্ত থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তরের কথা জানা যায়। পুলিশ বলেছে, অধিকতর স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত অভিযোগপত্রের জন্য এই পরিবর্তন। কিন্তু শুরুতেই যদি একটি প্রায় সম্পূর্ণ কাহিনি সামনে আসে, পরে তদন্ত সংস্থাও বদলে যায়, তাহলে নতুন করে সব তথ্য যাচাই করা স্বাভাবিক। আরেকটি প্রশ্ন এসেছে পুলিশ কমিশনারের বদলি নিয়ে। ২৫ আগস্ট আবদুল মাবুদকে সরিয়ে মাহবুবুর রশিদকে নতুন কমিশনার করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবদুল মাবুদকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে পদায়নের প্রজ্ঞাপন ১২ আগস্টই জারি হয়েছিল—হত্যাকাণ্ডের আগে। তাই এটিকে সরলভাবে হত্যাকাণ্ডের পরের শাস্তিমূলক বদলি বলা ঠিক হবে না। তাহলে কি পুলিশের বয়ান মিথ্যা? এখনই এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। আবার পুলিশের বয়ান প্রশ্নাতীত—এমন দাবিও করা যায় না। কিন্তু প্রশ্নও আছে: হত্যার সময়রেখা, ফেসবুক পোস্ট, আসামিদের অবস্থান, চারজনকে হত্যার বাস্তব পদ্ধতি, ময়নাতদন্তের সঙ্গে বয়ানের সামঞ্জস্য এবং আলামতের ফরেনসিক মিল। তদন্তে এখন জরুরি কয়েকটি কাজ: নিহতদের মৃত্যুর সময় নির্ধারণ; আগামী-সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা; সব মোবাইলের কললিস্ট ও লোকেশন যাচাই; আশপাশের সিসিটিভি সংগ্রহ; খেজুর, শসা, ইয়াবার সরঞ্জামসহ জৈবিক আলামতের ডিএনএ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষা; পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্তের সঙ্গে পুলিশি বয়ান মিলিয়ে দেখা; জবানবন্দির সঙ্গে বস্তুগত প্রমাণ যাচাই; স্বর্ণ উদ্ধারের উৎস ও সময় অনুসন্ধান; মাদক, ডাকাতি, সম্পত্তি, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য সব মোটিভ পরীক্ষা; এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাদ পড়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা। শেষ কথা: চারটি লাশের সঙ্গে যেন সত্যটাকেও কবর দেওয়া না হয়। গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক শুধু চারটি প্রাণের মৃত্যু নয়। ভয়াবহতার আরেকটি দিক হবে, যদি তাড়াহুড়োর তদন্তের নিচে সত্য চাপা পড়ে যায়। পুলিশকে আসামি ধরতে হবে, কিন্তু তার চেয়েও বড় দায়িত্ব সত্য শনাক্ত করা। দুই তরুণই যদি খুনি হন, তাঁদের বিরুদ্ধে এমন শক্তিশালী প্রমাণ হাজির করতে হবে, যাতে আদালতে অভিযোগ টেকে। আর যদি তাঁদের স্বীকারোক্তির বাইরে অন্য কোনো সত্য থাকে, সেটিও সামনে আসতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো প্রতিটি কথা সত্য নয়। কিন্তু সেখানে ওঠা প্রতিটি প্রশ্নও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কোনো প্রশ্ন মিথ্যা হলে প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা হোক, সত্য হলে তদন্তে যুক্ত করা হোক। কারণ চারটি লাশ কোনো প্রেস ব্রিফিংয়ের সমাপ্তি নয়; এটি একটি তদন্তের শুরু। শেষ পর্যন্ত পুলিশের গল্প নয়, প্রমাণের গল্পই জয়ী হওয়া উচিত। আমাদের প্রশ্ন তাই একটাই: আসলে কী ঘটেছিল সেই রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়িটিতে? উত্তর চাই গল্প হিসেবে নয়, প্রমাণসহ সত্য হিসেবে। লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>