বিজ্ঞাপন
শিক্ষক সংকট আর প্রশাসনিক জটিলতায় পাবনার প্রাথমিক শিক্ষা খাত যেন অভিভাবকহীন। প্রধান শিক্ষক ছাড়াই জেলার অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ পদগুলো শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনোরকমে চলছে কার্যক্রম। এতে একদিকে বাড়ছে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, অন্যদিকে নজরদারি ও জবাবদিহি দুর্বল হয়ে শিক্ষার মান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাবনার নয়টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫২২টিতে প্রধান শিক্ষক থাকলেও বাকি ৬১৬টি বিদ্যালয়ই চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৪ শতাংশ প্রাথমিকেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
আরও পড়ুন
নড়াইলে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৩২০ প্রাথমিক বিদ্যালয়
উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সাঁথিয়া, সুজানগর, চাটমোহর ও বেড়া উপজেলায়।
‘প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত করে বিদ্যালয় চলছে। এতে নেতৃত্বে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই এই ভারপ্রাপ্তদের মানতে নারাজ। ভারপ্রাপ্ত হয়ে যিনি দায়িত্ব পালন করছেন, অনেক ক্ষেত্রে তিনিও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। সবমিলিয়ে খুব সুশৃঙ্খলভাবে বিদ্যালয় চলছে না। শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার আগে শিক্ষকদের পদোন্নতি ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’
তথ্য বলছে, সাঁথিয়ায় ১৭৮টির মধ্যে ৯৪টি, সুজানগরে ১৪৫টির মধ্যে ৯৩টি, চাটমোহরে ১৫৫টির মধ্যে ৯০টি, বেড়ায় ১১২টির মধ্যে ৭৪টি, পাবনা সদরে ১৮৫টির মধ্যে ৭১টি, ভাঙ্গুড়ায় ৯৯টির মধ্যে ৫৪টি, ঈশ্বরদীতে ১০০টির মধ্যে ৪৯টি, ফরিদপুরে ৮৪টির মধ্যে ৪৮টি ও আটঘরিয়া উপজেলায় ৭৮টির মধ্যে ৪১টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে অন্য সহকর্মীরা তা সহজভাবে নেন না। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। দাপ্তরিক কাজেও নানা জটিলতা দেখা দেয়।
তারা আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। প্রধান শিক্ষক ছাড়া লিডারশিপ ট্রেনিংও দেওয়া হয় না। এদিকে নতুন করে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের জ্যেষ্ঠ দাবি করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দাবিতে মামলা করেছেন। এসব মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে আছে। তেমন নিয়োগ প্রক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। যেটির প্রভাব বিদ্যালয়ে পড়ছে।
‘আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এখন সেটি কেটেছে। পদোন্নতি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই সংকট ঘুচবে এবং বিদ্যালয়ের স্থবিরতা কাটবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত করে বিদ্যালয় চলছে। এতে নেতৃত্বে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই এই ভারপ্রাপ্তদের মানতে নারাজ। ভারপ্রাপ্ত হয়ে যিনি দায়িত্ব পালন করছেন, অনেক ক্ষেত্রে তিনিও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। সবমিলিয়ে খুব সুশৃঙ্খলভাবে বিদ্যালয় চলছে না। শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার আগে শিক্ষকদের পদোন্নতি ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
সদর উপজেলার ভজেন্দ্রপুরের একজন অভিভাবক রেজাউল বলেন, একজন শিক্ষককে দিয়ে যদি একইসঙ্গে অফিসের কাজ করানো হয় তাহলে সেই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রতি আর কতটুকু নজর দেবেন শিক্ষকরা। ফলে একটা ঘাটতি থেকেই যায়। এভাবেই আমাদের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন
চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৬৪২ বিদ্যালয়
চরতারাপুরের দিঘিগোহাইল বাড়ি এলাকার অভিভাবক রশিদ সরদার বলেন, শিক্ষক কম থাকায় ভালোমতো ক্লাস হয় না। সরকারের এ সংকটের দিকে নজর দেওয়া উচিৎ।
‘অভিভাবক ছাড়া পরিবার যেমন চলতে পারে না, তেমনি প্রধান শিক্ষক ছাড়া স্কুলের শৃঙ্খলা থাকে না। দ্রুত এ পদে পদোন্নতি দেওয়া জরুরি।’
এছাড়াও সদর উপজেলার জামরুল, হারুন ও বাবুলসহ আরও কয়েকজন অভিভাবক জানান, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগেই প্রধান শিক্ষক নেই। এতে বাচ্চাদের পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে না। ঠিকমতো শাসনও হচ্ছে না। শিক্ষকেরাও সময়মতো স্কুলে আসেন না। শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসার প্রতিও আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত।
পাবনা সদর উপজেলার ভজেন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, গত দুবছর আগে আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদলি হয়। এরপর থেকে এই পদে কাউকে দেওয়া হয়নি। এর আগে এক বছর অন্য ও শেষ এক বছর ধরে আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এতে আমাকে দ্বিমুখী চাপ সামলাতে হচ্ছে। দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি ক্লাসও নিতে হচ্ছে। আবার কখনো দাপ্তরিক কাজে ক্লাস নেওয়া সম্ভব না হলে সেটি অন্য শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে তো শতভাগ ট্রিটমেন্ট শিক্ষার্থীদের দেওয়া যায় না।
পাবনা সদরের দাশপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতিয়ার হোসেন বলেন, অভিভাবক ছাড়া পরিবার যেমন চলতে পারে না, তেমনি প্রধান শিক্ষক ছাড়া স্কুলের শৃঙ্খলা থাকে না। দ্রুত এ পদে পদোন্নতি দেওয়া জরুরি।
এদিকে সঠিক শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। কখনো কখনো প্রশ্ন ও শাস্তির মুখে পড়ছেন শিক্ষকরা। সম্প্রতি বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় জেলার ৩৬টি বিদ্যালয়ের শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
আরও পড়ুন
সিরাজগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ১০৫৬ বিদ্যালয়
শিক্ষকরা জানান, শোকজ পাওয়া সিংহভাগ স্কুলেই প্রধান শিক্ষকের পদ খালি।
পাবনা জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোমেন বলেন, প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এগুলো দ্রুতই নিরসন হবে।
তিনি বলেন, আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এখন সেটি কেটেছে। পদোন্নতি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই সংকট ঘুচবে এবং বিদ্যালয়ের স্থবিরতা কাটবে।
এনএইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন