বিজ্ঞাপন
একসময় দেশি মাছের ভান্ডার ছিল জামালপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, দশআনী ও সুবর্ণখালী নদী। জাল ফেললেই নৌকা ভরে যেত নানান প্রজাতির মাছে। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। অবৈধ জাল, নাব্য সংকট, পানি দূষণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে নদী-জলাশয়ে কমছে দেশি মাছ। ফলে মাছ না পেয়ে জীবিকা হারাচ্ছেন জেলার ২১ হাজার ৩১৮ নিবন্ধিত জেলে। অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন পেশা বদলাতে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে জাল টেনেও এখন আর আগের মতো বাতাই, বাঁশপাতালি, বউমাছ কিংবা চিংড়ির দেখা মেলে না। কখনো কয়েক ঘণ্টা নদীতে থাকার পর জালে ওঠে যৎসামান্য মাছ। সেই মাছ বিক্রি করে যে টাকা আসে, তা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন। ফলে নদীর সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জড়িয়ে থাকা জেলে পরিবারগুলোর জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
আরও পড়ুন
দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় করণীয়
জাল টেনেও মেলে না মাছ
ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি এলাকার জেলে সুভল দাসের জীবনচিত্র এই বাস্তবতারই এক করুণ প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন ভোরে সঙ্গীদের নিয়ে যমুনার পাড়ে ছুটে যান তিনি। এরপর নদীতে নৌকা ভাসিয়ে শুরু হয় মাছ ধরার চেষ্টা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনেও অনেক দিন তার ভাগ্যে জোটে মাত্র ১০০-২০০ টাকার মাছ।
‘একটা খেও দিতে এক দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। মাছ ওঠে এক-দেড়শ টাকার। ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনেছি। এগুলো দিয়ে খাব নাকি বিক্রি করব? আমার আর পোষায় না’—জেলে
জাল-নৌকা কিনতে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন সুভল। কিন্তু মাছের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে, সেই বিনিয়োগের খরচও তুলতে পারছেন না। তার ওপর রয়েছে তিন মেয়ের পড়াশোনা, সংসারের খরচ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা।
হতাশা প্রকাশ করে সুভল দাস বলেন, ‘একটা খেও দিতে এক দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। মাছ ওঠে এক-দেড়শ টাকার। ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনেছি। এগুলো দিয়ে খাব নাকি বিক্রি করব? আমার আর পোষায় না। আমার তিনডা মেয়ে আছে, লেখাপড়া আছে, সংসার খরচ আছে। মেয়েগুলাকে কেমনে বিয়ে দিমু এই এক-দেড়শ টাকার ভেতর? নদীতে মাছ নাই। দিন দিন কমে যাইতাছে। পানি আছে, আগের মতো মাছ নাই।’
আরও পড়ুন
গবেষণা / পাতে ফিরেছে বিলুপ্তপ্রায় ৪০ প্রজাতির দেশি মাছ
সুভলের মতো জেলার নদীনির্ভর বেশিরভাগ জেলের অবস্থা প্রায় একই। মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমেছে, বেড়েছে সংসারের চাপ। অনেকেই এখন নদীতে আগের মতো সময় দিতে চান না। কারণ, দিনভর পরিশ্রম করেও যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘কত রকমের দেশি মাছ যে ধরছি তার হিসাব নাই’
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মাছ ধরছেন জেলে জগন্নাথ নমশুদ্র। তার জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে যমুনার পানিতে জাল ফেলে। একসময় নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও এখন সেই দৃশ্য কেবল স্মৃতি হয়ে আছে।
‘আগে এই নদীতে জাল ফেললেই মাছ পাইতাম। দিন-রাইত নদীর পানিতেই থাকছি, কত রকমের দেশি মাছ যে ধরছি তার হিসাব নাই। জাল তুললেই ট্যাংরা, পুঁটি, বোয়ালি, আইড়, রুই-কাতলাসহ নানান মাছ উঠত। অহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফালাইয়া বইসা থাকলেও তেমন মাছ মেলে না’—জেলে
‘আগে এই নদীতে জাল ফেললেই মাছ পাইতাম। দিন-রাইত নদীর পানিতেই থাকছি, কত রকমের দেশি মাছ যে ধরছি তার হিসাব নাই। জাল তুললেই ট্যাংরা, পুঁটি, বোয়ালি, আইড়, রুই-কাতলাসহ নানান মাছ উঠত। অহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফালাইয়া বইসা থাকলেও তেমন মাছ মেলে না। নদীর পানি আছে, কিন্তু মাছ আর আগের মতো নাই। ৩৫ বছর ধইরা মাছ ধরতেছি, নিজের চোখের সামনে নদীর এমন পরিবর্তন দেখছি। আগের সেই মাছের দিনগুলা অহন শুধু মনে পড়ে’—বলেন জেলে জগন্নাথ নমশুদ্র।
শুধু মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই নন, নদীর মাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবন। কিন্তু নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় সেই ব্যবসাতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
ইসলামপুরের মাছ ব্যবসায়ী বিশু মালো জাগো নিউজকে বলেন, ‘নদীর মাছ দিয়ে আর সংসার চলে না। তাই পুকুরের মাছ বেচাকেনা করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
দেশি কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক, কারণ কী?
পোনা নিধনে বাড়ছে সংকট
জেলেদের অভিযোগ, দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও অতিরিক্ত সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে বড় মাছের পাশাপাশি নির্বিচারে ধরা পড়ছে ছোট মাছ ও মাছের পোনা। এতে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা এবং প্রজননক্ষেত্রে জাল ফেলায় স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
‘২০-৩০ বছর আগে আমরা যে মাছগুলো দেখছি, মারছি, খাইছি; এই মাছগুলো এখন পাওয়া যাচ্ছে না। বড় বড় বেড়জাল দিয়ে মাছ ঘিরে মারে। যদি ওঠে ৫০ হাজার, দেড় লাখ মাছ নষ্টই হয়। ডিম যে হচ্ছে পোকার মতো, ওরা তো ফেলে দিচ্ছে, বুঝতে পারছে না। এই নেটজাল, কারেন্ট জাল, চায়না জাল দিয়ে পাঁচটা মাছ ধরলে বিশটা নষ্ট করে’—জেলে
বড় বেড়জাল ও চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় প্রচুর পোনা নষ্ট হয় বলে জানান জেলে নিরঞ্জন চন্দ্র দাস। তার ভাষায়, ‘২০-৩০ বছর আগে আমরা যে মাছগুলো দেখছি, মারছি, খাইছি; এই মাছগুলো এখন পাওয়া যাচ্ছে না। বড় বড় বেড়জাল দিয়ে মাছ ঘিরে মারে। যদি ওঠে ৫০ হাজার, দেড় লাখ মাছ নষ্টই হয়। ডিম যে হচ্ছে পোকার মতো, ওরা তো ফেলে দিচ্ছে, বুঝতে পারছে না। এই নেটজাল, কারেন্ট জাল, চায়না জাল দিয়ে পাঁচটা মাছ ধরলে বিশটা নষ্ট করে। যেজন্য আমাদের দেশে মাছের সংকট দেখা যাচ্ছে।’
জেলেদের ভাষ্য, নদীতে মাছের প্রজননের সময় এবং ছোট মাছের বিচরণক্ষেত্রগুলোতে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পোনা ধ্বংস হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরবর্তী মৌসুমের মাছের প্রাপ্যতায়।
আরও পড়ুন
নিষিদ্ধ জালে অস্তিত্ব সংকটে দেশি মাছ
কমছে মাছের আবাসস্থল
শুধু অবৈধ জাল নয়, নদী-জলাশয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনও দেশীয় মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাব্য কমে যাওয়ায় নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠছে। শুকনা মৌসুমে ছোট নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি কমে বা শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে মাছের নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।
‘দিন দিন জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া এবং পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার কারণে মাছ স্রোতশীল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের প্রজননে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে’—ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মাছের বিচরণ, প্রজনন ও খাবার সংগ্রহের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। পানি দূষণও অনেক জলজ প্রাণীর জন্য তৈরি করছে বাড়তি ঝুঁকি।
একসময় বর্ষা মৌসুমে নদী-খাল-বিলের পানি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাছের বিচরণের সুযোগ তৈরি করত। এখন অনেক জায়গায় সেই সংযোগ কমে গেছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননের ক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
হুমকিতে জেলেদের ভবিষ্যৎ
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরে বর্তমানে ২১ হাজার ৩১৮ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ সরাসরি নদী ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
একদিকে মাছের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে জাল, নৌকা ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ বাড়ছে। ফলে অনেক জেলের আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না। কেউ কৃষিকাজে যাচ্ছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন, আবার কেউ বিকল্প পেশা বেছে নিচ্ছেন।
আরও পড়ুন
মৎস্য সম্পদ / চায়না দুয়ারী জালে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় মাছের উৎপাদন
জেলেদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে নতুন প্রজন্ম আর নদীতে মাছ ধরার পেশায় আসতে চাইবে না। এতে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে পারে নদীকেন্দ্রিক কয়েক প্রজন্মের পুরোনো একটি পেশা ও জীবনধারা।
হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য
জামালপুরের নদী-জলাশয়ের সংকট শুধু জেলেদের জীবিকার সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার জলজ জীববৈচিত্র্যও। দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি এখন আগের তুলনায় খুব কম দেখা যায়। কিছু মাছ স্থানীয়ভাবে প্রায় বিলুপ্তির পথে।
মাছের প্রজাতি কমে গেলে শুধু মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রভাব পড়ে না, জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হয়। নদী-খাল-বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে দেশীয় মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল সংরক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলেদের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে অবৈধ জাল জব্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, অভয়াশ্রমে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা কার্যকরভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিন দিন জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া এবং পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার কারণে মাছ স্রোতশীল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের প্রজননে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।’
প্রাকৃতিক ও চাষের মাছের স্বাদের পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাবারে ভেজাল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যের অভাবই এর জন্য দায়ী।
আরও পড়ুন
৫০০ টাকার নিচে মিলছে না দেশি মাছ
বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ৫০ প্রজাতি
জামালপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ন ম আশরাফুল কবীর জাগো নিউজকে বলেন, জামালপুরে প্রায় ২৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলার সাত উপজেলায় সাতটি অভয়াশ্রম রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদে আরও দুটি স্থায়ী অভয়াশ্রম নির্মাণের কাজ চলছে।
মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় আরও অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ এবং অভয়াশ্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশীয় মাছের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এসআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন