জাতীয়

কবি ও নাট্যকার লোরকার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি, নিষিদ্ধ হয় লেখাও

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
8 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী স্পেনের গৃহযুদ্ধ তখনকার পুরো প্রজন্মের মনকে প্রভাবিত করে। এই সংঘাত ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়ে ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্র এবং ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনীর মধ্যেকার যুদ্ধ। ফ্রাঙ্কো ছিলেন একজন সেনা জেনারেল। রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি একটি অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। অজস্র রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞের পর অবশেষে ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে এই অভ্যুত্থানে তিনি সফল হন। বিশ্বব্যাপী অনেক বুদ্ধিজীবী যুদ্ধটিকে বিবেচনা করেন জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সহিংসতার নিদর্শন হিসেবে। স্বৈরাচার ফ্রাঙ্কোর জাতীয়তাবাদী বাহিনী মরক্কোর স্প্যানিশ উপনিবেশ থেকে এবং স্পেনের দক্ষিণাংশ থেকে স্বপক্ষের লোকবল সংগ্রহ করে। ওদিকে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র পক্ষ স্পেনের উত্তরাংশ এবং কেন্দ্রীয় ভূখণ্ডের দখল নেয়। ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী এবং বামপন্থি দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটি আদর্শগত বিভাজন স্পষ্ট ছিল। এই বিভাজন সমগ্র পৃথিবীকেও বিভক্ত করে রাখে। কারণ অনেক দেশ একেক পক্ষকে তাদের সমর্থন দেয়। এই কারণে দ্বন্দ্বও বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকরা প্রজাতন্ত্রের পক্ষের লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে অনেক লেখক, কবি, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী এমনকি চলচ্চিত্র পরিচালকও ছিলেন। এঁদের কেউ কেউ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিখায়ও যুদ্ধ করেন। বিশ্বব্যাপী সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বোঝাপড়ার চেষ্টারত জাতীয়তাবাদী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অন্যরা যুদ্ধ করেছেন। মাদ্রিদের অবরোধে এবং স্পেনজুড়ে যুদ্ধে অনেকেই মারা যান। যারা বেঁচে ছিলেন; তারা প্রায়ই যুদ্ধের এই অভিজ্ঞতাকে তাদের সৃষ্টিকর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছেন। এখানে মূলত সেইসব লেখকদের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে; যাঁরা দ্বিতীয় স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্রের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। রাজতন্ত্রের দুর্বলতার ফলে স্পেন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের কুরুক্ষেত্র। রাজা আলফানসোর ক্ষমতাচ্যুতি, প্রিমো ডি রিভেরার সামরিক একনায়কত্ব, প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের নির্বাচনী সাফল্য এবং দক্ষিণপন্থি জোটের প্রতিক্রিয়া স্পেনের রাজনীতিতে তুমুল অস্থিরতার সৃষ্টি করে। এইরকম পরিস্থিতিতে জেনারেল এবং স্বৈরশাসক ফান্সিস ফ্রাঙ্কোর অংশগ্রহণ স্পেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করে আবার পুরোনো স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ফ্রাঙ্কো তার মরক্কোর সেনাবাহিনী নিয়ে স্পেনে পৌঁছান। ফ্রাঙ্কো নাৎসি জার্মানি এবং ফ্যাসিস্ট ইতালির সহায়তায় রক্তক্ষয়ী স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তার জাতীয়তাবাদী বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করে। এল কাউডিলো (দ্য লিডার) উপাধি গ্রহণ করে ফ্রাঙ্কো রাজনৈতিক বিরোধীদের চরম নিপীড়ন করেন। স্পেনের বাস্ক এবং কাতালান অঞ্চলের সংস্কৃতি এবং ভাষাকে দমন করেন, মিডিয়াকে গলা টিপে রুদ্ধ করেন এবং দেশের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করেন। ফ্রাঙ্কোর বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে শিথিল হয় এবং ১৯৭৫ সালে তার মৃত্যুর পরই দেশটিতে গণতন্ত্র চর্চা শুরু হয়। শুরুতে ভাবা হয়েছিল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদ কখনোই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে হারাতে পারবে না। স্পেনের কৃষক ও শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের অধিকারকে রক্ষা করার জন্য একজোট হয়েছিলেন। আশা করা হয়েছিল যে ফ্রাঙ্কোর এই স্পর্ধাকে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক রাস্ট্রসমূহ বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স কিছুতেই মুখ বুজে প্রশ্রয় দেবে না। কিন্তু প্রাথমিক উত্তেজনা কেটে যেতেই দেখা গেল সশস্ত্র হস্তক্ষেপ না করার অজুহাতে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পরোক্ষভাবে ফ্রাঙ্কোকেই সাহায্য করেছে। আর ফ্রাঙ্কোকে মদত দেবার জন্য ইতালি ও জার্মানি সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়ে। অচিরেই বোঝা গেল যে স্পেনের গৃহযুদ্ধ আদতে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া মাত্র। স্পেনের গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে ১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্ট বিশ্বনন্দিত কবি এবং নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ফ্যাসিস্ট সৈন্যদের গুলিতে খুন হন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত নাটকের মধ্যে রয়েছে ব্লাড ওয়েডিং, ইয়ারমা এবং দ্য হাউজ অব বার্নার্ডা আলবা। তার খুব সংক্ষিপ্ত এবং উদ্ভাবনী জীবনযাত্রার পুরোটা জুড়ে মৃত্যুই ছিল তার শৈল্পিক বিষয়বস্তুর কেন্দ্রীয় বিষয়। গৃহযুদ্ধের শুরুতে জাতীয়তাবাদী বাহিনী লোরকাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার দেহাবশেষ কখনো পাওয়া যায়নি এবং বিষয়টি বিতর্কিতই রয়ে গেছে। কেউ কেউ মনে করেন, সমকামী, সমাজতন্ত্রী বা উভয় কারণে তাঁকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। অন্যরা ব্যক্তিগত বিরোধকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেন। অনেক খোঁড়াখুড়ি হলেও লোরকার দেহাবশেষের অবস্থান স্পেন তথা সারা পৃথিবীর কাছে অন্যতম রহস্য হয়ে আছে আজও। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে লোরকা নিজের ভয়াবহ পরিণতির কথা হয়তো বুঝতে পেরে নিজের রচিত কবিতায় ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন:‌‘তখন বুঝলাম আমাকে খুন করা হয়েছে।তারা আমাকে ক্যাফে, কবরস্থান এবং গীর্জায় খুঁজেছে...কিন্তু তারা আমাকে খুঁজে পায়নি।তারা কি আমাকে খুঁজে পায়নি?নাহ্, তারা আমাকে খুঁজে পায়নি।’ লোরকার ন্যায় স্বজাতীয় চেতনার প্রতিনিধিত্বকারী এবং মূর্তকারী শিল্পী পৃথিবীতে বিরল। বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ কবি, নাট্যকার এবং থিয়েটার নির্দেশক লোরকা প্রজন্ম-২৭ এর প্রতীকী সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। বেশিরভাগ কবিদের নিয়ে গঠিত প্রজন্ম-২৭ ছিল এমন একটি দল যারা স্প্যানিশ সাহিত্যে ইউরোপীয় আন্দোলনের প্রতীকবাদ, ভবিষ্যতবাদ এবং পরাবাস্তববাদ মতবাদসমূহের প্রবর্তন করেছিলেন। স্পেনের ১৯২৭-এর প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল একদল কবি ও লেখকের সমন্বয়ে। তারা ১৯২০-এর দশকের শেষভাগে এসে বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মিলে ষোড়শ শতকের কবি লুইস ডি গঙ্গোরা ই আরগোটের মৃত্যুর শতবর্ষে তার কবিতার গুরুত্বপূর্ণ স্মারক সংস্করণ তৈরি করেন। কর্ডোবার চার্চের ক্যাথলিক যাজক লুইস দে গংগোরা ই আরগোট ছিলেন ষোড়শ শতকের স্প্যানিশ বারোক রীতির একজন গীতিকবি। গংগোরা এবং তাঁর আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সিসকো ডি কুয়েভেদোকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ স্প্যানিশ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর শৈলীর বৈশিষ্ট্যকে বলা হতো কালটারানিজমো। কালটারানিজমো হলো স্প্যানিশ ইতিহাসের বারোক যুগের একটি শৈলীগত আন্দোলন, যা লুইস ডি গঙ্গোরার পরে সাধারণত গঙ্গোরিজমো নামে পরিচিত হয়। পূর্ববর্তী প্রজন্ম ’৯৮-এর বেশিরভাগ গদ্য লেখক হলেও ১৯২৭-এর প্রজন্মের সদস্যদের কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই ছিলেন কবি। তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, রাফায়েল আলবার্টি, জর্জ গুইলেন, ভিসেন্তে আলেক্সান্দ্রে, লুইস সেরনুদা, পেদ্রো স্যালিনাস, জেরার্ডো দিয়েগো এবং দামাসো আলোনসো। সাধারণভাবে এই কবিরা প্রতীকবাদ, ভবিষ্যতবাদ এবং পরাবাস্তববাদের মতো বিস্তৃত ইউরোপীয় চলন দ্বারা প্রভাবিত হন এবং স্প্যানিশ সাহিত্যে এই চলন প্রবর্তন করতে সক্রিয় হন। তারা প্রথাগত ছন্দ এবং ছড়ার ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করেন। পাশাপাশি তাদের কবিতায় উপাখ্যানের ব্যবহার এবং কঠোর যৌক্তিক বর্ণনা বাতিল করেন। পরিবর্তে তারা রূপকের অবিচল ও সাহসী ব্যবহার করেন এবং নতুন শব্দ সৃষ্টি করেন। তারা অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসমূহকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে কবিতায় অত্যন্ত প্রতীকী বা সম্মোহক চিত্রকল্পের প্রয়োগ ঘটান। তারা গীতিনাট্য, ঐতিহ্যবাহী গান ও গীতিকবিতা এবং গংগোরার কবিতাকেও বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রজন্ম-১৯২৭-এর কবিদের প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র শৈলী এবং চিন্তায় ভিন্ন হলেও সম্মিলিতভাবে তারা ১৯২০, ৩০ এবং ৪০-এর দশকের শুরুতে স্প্যানিশ কবিতায় প্রভাবশালী বাঁক বদল ঘটান। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালে ঘটে যাওয়া স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ এবং এর পরের ঘটনা এই কবিদের চর্চার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধরনকে ভোঁতা করে দেয়। পরবর্তী স্প্যানিশ কবিতাগুলো তাদের পরিশীলিত এবং বিমূর্ত নান্দনিকতা থেকে দূরে সরে যায়। দক্ষিণ স্পেনের গ্রানাডা থেকে ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি ছোট শহর ফুয়েন্তে ভ্যাকেরোসে ১৮৯৮ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহণ করেন লোরকা। তাঁর পারিবারিক নাম ফেদেরিকো দেল সাগ্রাডো কোরাজন দে জেসুস গার্সিয়া লোরকা। গ্রানাডার নিকটে উর্বর উপত্যকায় তাঁর পিতা ফেদেরিকো গার্সিয়া রদ্রিগেজের সমৃদ্ধ একটি খামার ছিল। আবার শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি সম্ভ্রান্ত এলাকায় মনোরম একটি আবাসিক ভিলারও মালিক ছিলেন তিনি। গার্সিয়া রদ্রিগেজ চিনিশিল্পে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে তার সৌভাগ্যের মুখ দেখেন। গার্সিয়া লোরকার মা ভিসেন্টা লোরকা রোমেরো ছিলেন একজন শিক্ষক। ১৯০৫ সালে পরিবারটি ফুয়েন্তে ভ্যাকেরোস থেকে এরই কাছাকাছি শহর ভালদেররুবিও চলে আসে। তখন স্থানটির নাম ছিল আসকিওরোসা। ১৯০৯ সালে যখন লোরকার বয়স ১১ তখন ফের পুরো পরিবারটি প্রাদেশিক রাজধানী গ্রানাডায় বসবাস শুরু করে। সেখানে একটি উচ্চ বিদ্যালয় সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। তখনকার সময়ে গ্রানাডা শহরের উপকণ্ঠে তাদের বহুলপরিচিত গ্রীষ্মকালীন আবাসটির নাম ছিল হুয়ের্তা দে সান ভিসেন্টে। লোরকা সারাজীবন প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করতেই বেশি পছন্দ করতেন। স্বদেশ স্পেনের প্রতি তার ছিল অগাধ সম্ভ্রম। ফুয়েন্তে ভ্যাকেরোস, ভালদেররুবিও এবং হুয়ের্তা দে সান ভিসেন্টে; এই তিনটি বাড়িই আজ লোরকা জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯১৫ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর লোরকা গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার পাঠে আইন, সাহিত্য এবং সংগীত অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুরো কৈশোরজুড়ে তিনি সাহিত্যের চেয়ে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। ১১ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় কিউরেটর এবং সুরকার আন্তোনিও সেগুরা মেসার কাছে ছয় বছর মেয়াদি পিয়ানো শিক্ষা শুরু করেন। লোরকার সংগীতজীবনের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করেন সেগুরা। ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট সুরকার ক্লদ ডেবুসি, আঠারো শতকের রোমান্টিক যুগের মেধাবী সংগীত পরিচালক ও পিয়ানোবাদক ফ্রেডেরিক চোপিন এবং কিংবদন্তি জার্মান সুরকার লুডভিগ ভ্যান বিথোভেনের সংগীত থেকে লোরকার প্রথম শৈল্পিক অনুপ্রেরণা জন্ম নেয়। পরবর্তীতে সুরকার ম্যানুয়েল দে ফাল্লার সাথে বন্ধুত্বের সূত্রে স্প্যানিশ লোকসাহিত্য অবলম্বনে তার শিল্পসৃষ্টিসমূহ মোহনীয় জাদুতে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে সেগুরার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গার্সিয়া লোরকা তেমনভাবে লেখালেখি শুরু করেননি। তার প্রথম দিকের গদ্য রচনাসমূহ যেমন ‌‘নকটার্ন’, ‘ব্যালাডে’ এবং ‘সোনাটা’ সংগীতের বিন্যাস বিষয়ে আলোকপাত করে। ১৯১৬ এবং ১৯১৭ সালে লোরকা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফার্নান্দো দে লস রিওসের সাথে উত্তর স্পেনের কাস্তিল, লিওন এবং গ্যালিসিয়া অঞ্চল ভ্রমণ করেন। রিওস তাকে তার প্রথম গ্রন্থ ‘ইমপ্রেশনেস ওয়াই পাইজেস’ (ইংরেজিতে ইমপ্রেশনস অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপস) লেখার জন্য উৎসাহিত করেন। গ্রন্থটি লোরকার পিতার অর্থায়নে ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয়। ইমপ্রেশনস অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ গ্রন্থটিতে লোরকা তার শিক্ষা সফরে ভ্রমণকৃত স্পেনের বিভিন্ন ভৌগলিক স্থানের বর্ণনার সংকলন করেন। সেইসাথে গ্রানাডাকে উৎসর্গীকৃত একটি সিরিজ, আরেকটি উদ্যানের জন্য এবং শেষেরটি বিবিধ প্রসঙ্গ। তিনি তার প্রাক্তন সংগীত শিক্ষক আন্তোনিও সেগুরা মেসাকে বইটি উৎসর্গ করেন। তিনি প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য এবং কবিতা সম্পর্কে তার রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের মাধ্যমে একটি প্রস্তাবনা দিয়ে শুরু করেন। সেইসাথে গ্রন্থটির প্রতি তাঁর কম প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন। লোরকাকে ১৯১৯ সালে মাদ্রিদের প্রগতিশীল ও অক্সব্রিজ-অনুপ্রাণিত রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেসে যেতে দেওয়ার জন্য তাঁর পিতা-মাতাকে রাজি করান অধ্যাপক রিওস। লোরকা মূলত নামমাত্র মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যোগ দেন। মাদ্রিদে অবস্থিত স্প্যানিশ সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেস ছিল আক্ষরিক অর্থে একটি ছাত্রাবাস। বোলোগনা, সালামানকা, কেমব্রিজ বা অক্সফোর্ডের ধ্রুপদী মহাবিদ্যালয়সমূহের রীতিতে শিক্ষার্থীদের আবাসনের উদ্দেশ্যে রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেস প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ছাত্রাবাসটি স্পেনের সবচেয়ে উজ্জ্বল তরুণ চিন্তাবিদ, লেখক এবং শিল্পীদের বৌদ্ধিক মেজাজকে লালন ও সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করত। স্পেনে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকের দশকগুলো রৌপ্য যুগ হিসেবে অভিহিত। রৌপ্য যুগটি সমৃদ্ধ ধারণাসমূহের বৌদ্ধিক প্রসারের এমন একটি সময় ছিল; যখন শব্দ ও চিত্র মাধ্যম শৈল্পিক এবং রাজনৈতিক উভয়ভাবেই প্রকাশের একটি নতুন শক্তি অর্জন করে। এই রৌপ্য যুগটি তিনটি প্রজন্মে বিভক্ত। যথা:- ’৯৮-এর প্রজন্ম, ’১৪-এর প্রজন্ম এবং ’২৭-এর প্রজন্ম। ১৯১০ সালে এর ভিত্তিকাল থেকে ১৯৩৬ সালে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেসের বিশেষ শক্তিশালী প্রভাব ছিল। এই সময়ের মধ্যে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, লুইস বুনুয়েল, জুয়ানকাজাডোর, সালভাদর ডালি, হোসে ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট, রাফায়েল আলবার্টি, দামাসো আলোনসো, লুইস সেরনুদা, মিগুয়েল দে উনামুনো, আন্তোনিও মাচাডো এবং নাট্যব্যক্তিত্ব রেমন দেল ভাল্লে ইনক্লান প্রমুখের ন্যায় নন্দিত স্প্যানিশ শিল্পী, লেখক, ’৯৮-এর প্রজন্ম এবং ’২৭-এর প্রজন্মের সদস্যরা এখানে বসবাস এবং অধ্যয়ন করেছেন। এ ছাড়া আলবার্ট আইনস্টাইন, হাওয়ার্ড কার্টার, গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন, পল ভ্যালেরি, মেরি কুরি, ইগর স্ট্রাভিনস্কি, পল ক্লডেল, লুই ডি ব্রগলি, হার্বার্ট জর্জ ওয়েলস, ম্যাক্স জ্যাকব, লে করবুসিয়ার, জন মেনার্দ কিনেস প্রমুখ বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবনী চিন্তাবিদরা বক্তৃতা দিতে রেসিডেন্সিয়া এ প্রতিষ্ঠানে এসেছেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধের ফলে এই বুদ্ধিবৃত্তিক যুগের সমাপ্তি ঘটে। এরপর বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি লাইনচ্যুত হয়। অনেক শিল্পী এবং লেখককে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয় এবং ফ্রাঙ্কো অধিকৃত স্পেনে সেন্সরশিপ বৃদ্ধি পায় অতি মাত্রায়। বহু বছর পর স্পেন গণতন্ত্রে উত্তরণের পর থেকে আবার রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেসকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রেসিডেন্সিয়া দে এসতুদিয়ান্তেসে গার্সিয়া লোরকা তখন কবি জুয়ান রামন জিমেনেজের শাখার অধীনে ছিলেন। তিনি নাট্যকার এডুয়ার্ডো মারকুইনা এবং মাদ্রিদের তিয়েত্রো এসলাভার পরিচালক গ্রেগোরিও মার্টিনেজ সিয়েরার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ১৯১৯-২০ সালে মার্টিনেজ সিয়েরার আহ্বানে তিনি তার প্রথম নাটক ‘দ্য বাটারফ্লাই’স ইভিল স্পেল’ রচনা এবং মঞ্চস্থ করেন। এটি ছিল একটি তেলাপোকা এবং একটি প্রজাপতির মধ্যে অসম প্রেমকে নাটকীয় রূপ দেওয়া একটি পদ্যনাটক। নাটকটিতে অন্যান্য পোকামাকড়ের চরিত্রও ছিল। মাত্র চারটি প্রদর্শনীর পরই নাটকটি দর্শকের উপহাসে বিদ্ধ হয়। বিষয়টি মঞ্চনাটকের দর্শকদের প্রতি অবশিষ্ট জীবনভর লোরকার মনোভাবকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি পরে দাবি করেন যে ১৯২৭ সালে রচিত ‘মারিয়ানা পিনেদা’ আসলে তার প্রথম নাটক। রেসিডেনসিয়া দে এসতুদিয়ান্তেসে থাকাকালীন তিনি আইন ও দর্শনে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, যদিও অধ্যয়নের চেয়ে লেখালেখির প্রতিই তার আগ্রহ ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি। লোরকার প্রথম কবিতার বই ‘লিবরো দে পোয়েমাস’ ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯১৮ সাল থেকে লিখিত সবগুলো কবিতা থেকে বাছাই করে প্রকাশ করা হয়। কবিতাসমূহ ধর্মীয় বিশ্বাস, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রকৃতির বিষয়বস্তু বিষয়ে সংশ্রব প্রকাশ করে, যা তার গদ্যকে প্রতিবিম্বিত করেছে। ১৯২২ সালের শুরুর দিকে লোরকা গ্রানাডায় ‘কনকার্সো দে ক্যান্টে জোন্ডো’ উৎসবের প্রচারণায় সুরকার ম্যানুয়েল দে ফাল্লার সাথে যোগ দেন। উৎসবটি গিটার বাজিয়ে নেচে গেয়ে উদযাপনের ফ্ল্যামেনকো রীতির ক্যান্টে জোন্ডো শৈলীর বিকাশে উৎসর্গীকৃত। এক বছর আগে গার্সিয়া লোরকা ‘পোয়েম অব ডিপ সং’ লিখতে শুরু করেন, যা ১৯৩১ সালের আগ পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি। তাই তিনি স্বাভাবিকভাবেই ফ্ল্যামেনকো শিল্পরীতি বিষয়ক একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। জুনে অনুষ্ঠিত সংগীত উৎসবে তিনি বিখ্যাত ফ্ল্যামেনকো শিল্পী ম্যানুয়েল টরের সাথে দেখা করেন। পরের বছর গ্রানাডায় তিনি ‘দ্য গার্ল দ্যাট ওয়াটারস দ্য বেসিল অ্যান্ড দ্য ইনকুইসিটিভ প্রিন্স’ শিশুতোষ নাটকের আবহ সংগীত নির্মাণে ম্যানুয়েল দে ফাল্লা এবং অন্যান্যদের সহযোগিতা নেন। আন্দালুসীয় একটি গল্প অবলম্বনে লোরকার এই নাটকটি রচিত। পরের কয়েক বছরে লোরকা ক্রমশ স্পেনের আভাঁ-গার্দে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি ক্যানসিওনস (গান) নামে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেন, যদিও সাধারণ অর্থে সংকলনটিতে কোনো গান ছিল না। এর কিছুদিন পরে ১৯২৭ সালের ২৫ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত বার্সেলোনার গ্যালারিজ ডালমাউ-তে লোরকা তার পেইন্টিং সিরিজ প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রিত হন। জনপ্রিয় এবং আভাঁ-গার্দে শৈলীর মিশ্রণে লোরকার স্কেচসমূহ ছিল ক্যানসিওনের পরিপূরক। সেই বছরই সালভাদর ডালির মঞ্চ সজ্জায় তার দ্বিতীয় নাটক মারিয়ানা পিনেদা বার্সেলোনায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। ১৯২৬ সালে লোরকার লেখা ‘দ্য শুমেকারস প্রডিজিয়স ওয়াইফ’ নাটকটি ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে মঞ্চায়ন হয়। একজন প্রগলভ্, ছেনাল স্ত্রী এবং জনৈক স্ত্রৈণ চর্মকারের মধ্যে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভট খেয়ালের একটি প্রহসন। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্য রোমান্সেরো গিটানো (জিপসি ব্যালাডস)। এই কাব্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। গ্রন্থটিতে তিনি তার জন্মভূমি আন্দালুসিয়ার জীবনকে ছবির মতো করে তুলে ধরেন। তার কবিতায় ঐতিহ্যগত আন্দালুসীয় মোটিফ এবং প্রগতির পুরোধা শৈলী অন্তর্ভুক্ত ছিল। লোরকা ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত সালভাদর ডালির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ছিলেন। ‘জিপসি ব্যালাডস’-এর সাফল্যের পর ডালির সাথে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। পরিবারের সৌজন্যে তিনি ১৯২৯-৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সফর করেন। ১৯২৯ সালের জুন মাসে লোরকা আরএমএস অলিম্পিক জাহাজে চড়ে অধ্যাপক ফার্নান্দো দে লস রিওসের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যান। আরএমএস অলিম্পিক জাহাজটি ছিল ডুবে যাওয়া বিখ্যাত জাহাজ আরএমএস টাইটানিকের একই লাইনার। অধ্যাপক রিওস ছিলেন রাজনৈতিক আইন বিষয়ের অধ্যাপক। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ রিওস ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্রের শুরুর বছরগুলোতে আইন ও বিচার মন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধকালে তিনি ফ্রান্সে এবং তারপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি এবং লোরকা উভয়েই বেশিরভাগ সময় নিউইয়র্ক শহরে থাকতেন। সেখানে রিওস একটি বক্তৃতা ভ্রমণ শুরু করেন। ওদিকে লোরকা তাঁর পিতামাতার অর্থায়নে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব জেনারেল স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি অধ্যয়ন করেন কিন্তু আগের মতোই পড়াশোনার চেয়ে লেখাই তাঁকে বেশি টানত। লোরকা উত্তর-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে অবস্থিত ভার্মন্টে এবং পরে কিউবার হাভানায়ও ভ্রমণ করেছেন। তাঁর সেই সময়ে রচিত গ্রন্থ ‘পোয়েটা এন নুয়েভা ইয়র্ক’ (নিউ ইয়র্কের কবি) ১৯৪২ সালে মরণোত্তর প্রকাশিত হয়। স্বদেশে ফিরে তিনি তাঁর বিখ্যাত সব নাটক লিখেছেন, ব্লাড ওয়েডিং (১৯৩২), ইয়েরমা (১৯৩৪) এবং দ্য হাউজ অব বার্নার্ড আলবা (১৯৩৬)। ১৯৩০ সালে লোরকার স্পেনে প্রত্যাবর্তন এবং কাকতালীয়ভাবে একই বছরে প্রিমো ডি রিভেরার একনায়কতন্ত্রের পতন এবং দ্বিতীয় স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৩১ সালে লোরকা একটি স্টুডেন্ট থিয়েটার কোম্পানির পরিচালক নিযুক্ত হন। থিয়েটার কোম্পানিটির নাম ‘টেট্রো ইউনিভার্সিটিরিও লা বাররাকা’। দ্বিতীয় স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অর্থায়নকৃত এই থিয়েটার দলের উদ্দেশ্য ছিল বিনামূল্যে ধ্রুপদী স্প্যানিশ থিয়েটারের সাথে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সেই লক্ষ্যে থিয়েটার কোম্পানিটি স্পেনের গ্রামীণ অঞ্চলসমূহে গিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করার দায়িত্ব পায়। একটি বহনযোগ্য ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ এবং সামান্য সরঞ্জাম সম্বল করে তারা থিয়েটারকে এমন জনগণের সামনে প্রদর্শন করত, যারা কখনো গার্সিয়া লোরকার পরিচালনা ও অভিনয় দেখেনি। লোরকা বলতেন, ‘মাদ্রিদের বাইরে থিয়েটারটি ছিল সেইসব কষ্টভোগী মানুষের জীবনের অংশসম। মনে হতো তারা তাদের দৃষ্টিশক্তি অথবা স্বাদের অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে। আমরা তাদের দৃষ্টি ও স্বাদ ফিরিয়ে দিতে সচেষ্ট।’ দরিদ্র গ্রামীণ স্পেন এবং নিউ ইয়র্কের ভোটাধিকারহীন আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর ভেতরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে থিয়েটারের সমাজবদ্ধ আন্দোলনের একজন প্রগাঢ় প্রবক্তায় রূপান্তরিত করে। তিনি লিখেছেন, ‘থিয়েটার হলো কান্না ও হাসির পাঠশালা এবং মুক্ত সম্মেলনস্থান। এখানে মানুষেরা প্রচলিত বা ভুল প্রথাসমূহকে প্রশ্ন করে এবং মানব হৃদয়ের চিরন্তন নিয়মগুলোকে জীবন্ত উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করে।’ লা ব্যারাকার থিয়েটার দলের সাথে ভ্রমণকালে লোরকা তাঁর সর্বকালের অতি পরিচিত নাটকসমূহ লিখেছেন। ব্লাড ওয়েডিং-এর ‘গ্রামীণ ত্রয়ী’, ইয়ারমা এবং বার্নার্ডা আলবা হাউজ ইত্যাদি নাটকসমূহ বুর্জোয়া স্প্যানিশ সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তিনি ইউরোপীয় থিয়েটারের শেকড়ের পুনঃআবিষ্কার এবং সেই সময়ের জনপ্রিয় ড্রয়িং-রুম কমেডির মতো আরামদায়ক প্রযোজনাসমুহকে প্রশ্ন করার আহ্বান জানান। ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে রিপাবলিকান অ্যাসাল্ট গার্ডস কর্তৃক হোসে ক্যালভো সোটেলোকে হত্যার পর স্পেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা ব্যাপক ও তীব্র হয়ে ওঠে। ক্যালভো সোটেলোর প্রথম ডিউক স্পেনের আইনবিদ এবং রাজনীতিবিদ হোসে ক্যালভো সোটেলো ছিলেন বিশিষ্ট রাজতন্ত্রবাদী এবং পপুলার ফ্রন্ট বিরোধী একজন মুখপাত্র। মিগুয়েল প্রিমো ডি রিভেরার একনায়কত্বের সময় হোসে ছিলেন অর্থমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের সময় একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। এই সময়কালে তিনি রাজতন্ত্রী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। সমাজতান্ত্রিক পার্টির নেতা ইন্দালেসিও প্রিয়েটোর দেহরক্ষীর গুলিতে খুন হন হোসে। হত্যাকাণ্ডটি ছিল ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ষড়যন্ত্র করা সামরিক অভ্যুত্থানের সূচনা মাত্র। এই দূর্ঘটনাকে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি আংশিক ব্যর্থতা বলেও মনে করা হয়। হোসে ছিলেন স্বৈরশাসক জেনারেল মিগুয়েল প্রিমো দে রিভেরার জ্যেষ্ঠপুত্র এবং স্প্যানিশ ফ্যাসিস্ট পার্টি ফালাঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা। কবি লোরকা তাঁর স্পষ্টবাদী সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ক্রমবর্ধমান ডানপন্থিদের বিরাগভাজন হন। ১৯৩৬ সালের আগস্টে তাঁর গ্রেফতার ও হত্যার ঠিক আগের দিনগুলো কবি হুয়ের্তা দে সান ভিসেন্টেতে কাটিয়েছেন। সেই সময় গ্রানাডা এতটাই উত্তাল ছিল যে, কয়েক মাস ধরে সেখানে কোনো মেয়র ছিল না। মেয়র পদে আসীন হওয়ার মতো সাহসী এমন কেউ ছিলও না। লোরকার ভগ্নিপতি ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ-মন্টেসিনোস মেয়র পদটি গ্রহণ করতে সম্মত হন। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনিও নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। ১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্টের সেই একই দিনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন; যেদিন লোরকাকে গ্রেফতার করা হয়। ধারণা করা হয় যে, লোরকাকে ১৯ আগস্ট তারিখেই জাতীয়তাবাদী মিলিশিয়ারা গুলি করে হত্যা করে। লোরকার মৃত্যুর ইতিহাসটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে লোরকা তার সংরক্ষণপ্রবণ শহর গ্রানাডায় নিজ পরিবারের সাথে থাকার জন্য মাদ্রিদের নিরাপদ ছিটমহল ছেড়ে যাওয়ার বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ওখানে পৌঁছানোর প্রায় সাথে সাথেই বিদ্রোহী জাতীয়তাবাদী ফালাঞ্জিস্টরা এলাকাটি দখল করে নেয়। প্রকাশ্যে একটি অরাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা সত্ত্বেও দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের সাথে তাঁর যোগসাজশ, ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়ন বিষয়ে তাঁর নাটক নির্মাণ ও প্রদর্শন এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাত্কারে আংশিক ক্যাথলিক-বিরোধী বক্তব্য লোরকাকে বিদ্রোহীদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। লোরকার প্রতি জাতীয়তাবাদীদের ঘৃণার আরেকটি সহায়ক কারণ ছিল তাঁর সমকামিতা। লোরকা আত্মগোপনে চলে গেলেও ফালাঞ্জিস্টরা তাঁকে অবশেষে খুঁজে বের করে। ১৬ আগস্ট তাঁকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বিনা বিচারে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯ আগস্ট আনুমানিক ৩টায় তাঁকে অন্য একজন বন্দির সাথে হাতকড়া পরানো হয়। সেই বন্দি লোকটি ছিলেন একজন শিক্ষক। উভয়কে একটি গাড়িতে করে ভিজনারের লা কোলিনা নামক একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ফালাঞ্জ বাহিনী ভবনটিকে দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য কয়েদখানা হিসেবে ব্যবহার করছিল। ভোরের কিছুক্ষণ আগে পূর্বোক্ত শিক্ষক এবং অন্য দুজন পেশাদার বুলফাইটার কয়েদিসহ লোরকাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বুলফাইটার সেই দুজন বন্দি ছিলেন নৈরাজ্যবাদী ট্রেড ইউনিয়ন সিএনটির সক্রিয় সদস্য। একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন যে, লোরকাকে নির্দয় নির্যাতন করার উদ্দেশ্যে অন্য বন্দিদের থেকে আলাদা করা হয়। ঘাতকের হিংস্র বুলেটের আঘাতে পিঠ এবং বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় লোরকার। তারপর বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক এবং স্পেনের সবচেয়ে বিস্ময়কর সন্তানদের একজন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মৃতদেহ তাড়াহুড়ো করে গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়। লেখক গবেষক ইয়ান গিবসন তার ‘দ্য অ্যাসাসিনেশন অব গার্সিয়া লোরকা’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, কবিকে অন্য আরও তিনজনের সাথে গুলি করা হয়। তারা ছিলেন জোয়াকিন আরকোলাস ক্যাবেজাস, ফ্রান্সিসকো গালাদি মেলগার এবং ডিয়োসকোরো গালিন্দো গোনসালেস। হত্যার স্থানটি ছিল ফুয়েন্তে গ্র্যান্ডে বা চমৎকার বসন্ত নামে পরিচিত। জায়গাটি ভিজনার এবং আলফাসারের মধ্যবর্তী রাস্তায়। দীর্ঘবছর পর ২০১৫ সালের এপ্রিলে রেডিও স্টেশন ক্যাডেনা এসইআর দ্বারা প্রকাশিত পুলিশ রিপোর্টসমূহের উপসংহারে বলা হয়, লোরকাকে ফ্যাসিবাদী বাহিনী কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওদিকে ফ্রাঙ্কো-যুগের ১৯৬৫ সালের ৯ জুলাই তারিখে প্রকাশিত রিপোর্টে লোরকাকে একজন ‘সমাজবাদী’ এবং ‘আলহামব্রা লজের অন্তর্গত ফ্রিম্যাসন’ হিসেবে বর্ণনা করে, যিনি ‘সমকামী’ এবং ‘অস্বাভাবিক চর্চা’র সাথে জড়িত ছিলেন। গ্রানাডার প্লাজা দেল কারমেনে লোরকার বই পুড়িয়ে ফেলা হয়। খুবই দ্রুততার সাথে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর দখলকৃত স্পেন থেকে লোরকার যাবতীয় রচনাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মৃতদেহ ঠিক কোথায় আছে আজ অবধি তা সবার অজানা। জনপ্রিয় একজন জাতীয় বীরের মৃতদেহ বিজয়ী জাতীয়তাবাদীরা হীনভাবে লুকিয়ে ফেলে। ১৯৭৫ সালে স্বৈরশাসকের মৃত্যু পর্যন্ত তার সমস্ত কাজের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। লোরকার নাটকগুলো সারা বিশ্বের কোনো না কোনো জায়গায় প্রায়ই মঞ্চস্থ হয়, তার নাটকগুলোই তাকে মনে রাখার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করা হয়। আরও পড়ুন ‘সালিশ’ শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না হুরবানুর কথার রেশ এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>