বিজ্ঞাপন
দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা প্রবীর মিত্র। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। নায়ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে। অভিনয়ের প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অভিনয়ের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিলেন এই গুণী শিল্পী।
আজ (১৮ আগস্ট) প্রবীর মিত্রের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের এই দিনে চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের শাক্তায়। তবে শৈশব কেটেছে ঢাকাতেই। ঢাকার কোতোয়ালি থানার হরিপ্রসন্ন মিত্র রাস্তাটিও তার দাদার নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। বিএসসি পাস করার পর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ইতি টানেন তিনি।
স্কুলে পড়ার সময়ই অভিনয়ের হাতেখড়ি প্রবীর মিত্রের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে প্রহরীর চরিত্রে অভিনয় করে প্রথমবার মঞ্চে ওঠেন তিনি। এরপর পুরান ঢাকার লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করেন। পরিচালক এইচ আকবরের হাত ধরে ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। এই সিনেমার গল্প ও সংলাপ লিখেছিলেন তার স্কুলজীবনের বন্ধু ও পরবর্তী সময়ে কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান।
১৯৬৮ সাল থেকে চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন প্রবীর মিত্র। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নায়ক হিসেবেও অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকটি সিনেমায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নির্মিত রঙিন ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। চরিত্রটিতে তার অনবদ্য অভিনয় দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।
প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় সিনেমা ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। এই সিনেমায় অভিনয় তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘জলছবি’, ‘অঙ্গার’, ‘পুত্রবধূ’, ‘নয়নের আলো’, ‘জয়পরাজয়’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘মহামিলন’, ‘প্রিয়জন’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘এই তো ভালোবাসা’, ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’সহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।
‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৯৮৩ সালে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন প্রবীর মিত্র। অভিনয়ের প্রতি তার এই নিষ্ঠাই তাকে দেশের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতার মর্যাদা এনে দেয়।
তবে অভিনয়জীবনের ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে সবসময় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি প্রবীর মিত্র। স্ত্রীই সামলে নিয়েছেন সংসার ও সন্তানদের। স্ত্রী সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে প্রবীর মিত্র বলেছিলেন, সন্তানদের দায়িত্ব পালনে তিনি স্ত্রীকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু একজন বাবার পাশাপাশি মায়ের দায়িত্বও তার স্ত্রীই যথাযথভাবে পালন করেছেন।
আরও পড়ুন
অশ্লীল গান গাইতে চাননি কুমার শানু, তবু কেন গাইলেন?
প্রবীর মিত্রের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের কেউই অভিনয়ে আসেননি। কেন তারা অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেননি-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবীর মিত্র জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে তিনি কখনো অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি। তবে তার ধারণা ছিল, সন্তানদের মা হয়তো তাদের অভিনয়ে আসতে নিষেধ করেছিলেন কিংবা নিরুৎসাহিত করেছিলেন।
এর পেছনে অবশ্য অন্যরকম একটি কারণও ছিল। প্রবীর মিত্রের স্ত্রী অভিনয়কে অপছন্দ করতেন-বিষয়টি এমন নয়। বরং স্বামীর অভিনয়ের প্রতি তিনি সবসময় উৎসাহ দিতেন। কিন্তু একজন অভিনেতাকে পেশাগত কারণে কী ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি।
প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবনে এমন অনেক সময় গেছে, যখন শুটিংয়ের কারণে দিনের পর দিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এখনকার মতো মোবাইল ফোন কিংবা উন্নত যোগাযোগব্যবস্থাও তখন ছিল না। দেশের দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে শুটিং করতে হতো। অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখারও সুযোগ থাকত না।
এই বাস্তবতাই হয়তো প্রবীর মিত্রের স্ত্রীকে সন্তানদের অভিনয়ে আসার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেছিল। কারণ তিনি জানতেন, অভিনয় শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে চরিত্র ফুটিয়ে তোলা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং নানা ধরনের ত্যাগ।
আরও পড়ুন
আরাধ্যার স্বাস্থ্য নিয়ে ভুয়া খবর, এবার হাইকোর্টে নতুন প্রশ্ন
তখন অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়াও বর্তমান সময়ের মতো সহজ ছিল না। প্রবীর মিত্র নিজেও অর্থের লোভে নয়, বরং মনের টানেই অভিনয় করে গেছেন। কী পাবেন বা কী পাবেন না-এসব হিসেব কখনো করেননি। অভিনয়কে তিনি প্রার্থনার মতো মনে করতেন। অন্য পেশায় নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করেও সফল হননি। বরং নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করতেন, যা তাকে রঙ্গমঞ্চ ও চলচ্চিত্রের জগতে টেনে এনেছিল।
ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার চেষ্টা করতেন প্রবীর মিত্র। অভিনয় তার জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চেয়েছিলেন তিনি।
প্রবীর মিত্র। ছবি: সংগৃহীত
প্রবীর মিত্রের ছোট ছেলে আকাশ ২০১২ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে মারা যান। সন্তান হারানোর সেই বেদনা কখনোই ভুলতে পারেননি এই অভিনেতা। স্ত্রীও ২০০০ সালে মারা যান। এ প্রসঙ্গে জীবদ্দশায় প্রবীর মিত্র জানিয়েছিলেন, স্ত্রী পরম মমতায় সংসার আগলে রেখেছিলেন বলেই তিনি অভিনয়জীবনে এতটা সময় দিতে পেরেছিলেন।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে প্রবীর মিত্র হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি মারা যান এই কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা। কিন্তু অসংখ্য সিনেমায় তার অভিনয় এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্রগুলো আজও দর্শকের মনে অমলিন।
এমএমএফ
বিজ্ঞাপন