বিজ্ঞাপন
বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল নাম হয়ে থাকে না; তারা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক, একটি শিল্পবোধের নির্মাতা, একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভাষ্যকার। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন তেমনই এক বিরল স্রষ্টা। তাঁর জন্মদিন এলেই মনে হয়, বাংলা নাটকের আকাশে যে নক্ষত্রটি একদিন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল, তার আলো আসলে কোনো একক মঞ্চকে আলোকিত করেনি-সে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার জনপদে, নদীর ঘাটে, হাটের ভিড়ে, গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনায়, লোকস্মৃতির গভীরে এবং মানুষের বহুকালের না-বলা কথার ভেতর।
১৮ আগস্ট বাংলা নাটকের এই গৌড়জনের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে সীমান্তবর্তী ফেনী জেলার সমুদ্রঘেঁষা সোনাগাজী উপজেলার সেনের খিলে জন্ম নিয়েছিলেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা নাটকের অন্যতম প্রধান পুরুষ সেলিম আল দীন। তাঁর জন্ম যেন নিছক একজন নাট্যকারের জন্ম ছিল না; ছিল বাংলা নাটকের নিজস্ব আত্মস্বর খুঁজে পাওয়ার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা।
বাংলা নাটক তখন নানা প্রভাব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্বেষণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। পাশ্চাত্যের নাট্যরীতি, আধুনিকতার নানা অভিঘাত এবং নগরজীবনের অভিজ্ঞতা নাট্যচর্চাকে প্রভাবিত করছিল। কিন্তু সেলিম আল দীন যেন প্রশ্ন তুললেন- বাংলার নাটক কি বাংলার মাটি, মানুষ, লোকঐতিহ্য, পুরাণ, কৃষিজীবন, নদী, নৌকা, মেলা, গান, পালা, কিস্সা, লোকবিশ্বাস ও হাজার বছরের জীবন-অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে নিজের ভাষা খুঁজে নিতে পারে না? তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সারা জীবন। আর সেই অনুসন্ধানের ফলেই বাংলা নাটক একদিন নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে তাকানোর সাহস পেয়েছে।
সেলিম আল দীনের পিতা মরহুম মফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা মরহুমা ফিরোজা খাতুন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে সেলিম আল দীন ছিলেন তৃতীয়। শৈশবের সেই গ্রামীণ ভূগোল, মাটির গন্ধ, মানুষের মুখ, লোকজীবনের বহুবর্ণ অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর সৃষ্টিশীলতার গভীরে প্রবেশ করে। তাঁর নাটকে তাই শহরের কৃত্রিম আলো যতটা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে মাটির প্রদীপের আলো; প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার চেয়ে বেশি আছে মানুষের মুখের ভাষা; কাগুজে চরিত্রের চেয়ে বেশি আছে জীবনের ধুলো-মাটি মেখে ওঠা মানুষ।
যতদিন বাংলার মাটিতে মানুষ তার নিজের গল্প বলতে চাইবে, যতদিন বাংলা ভাষা তার নিজস্ব সুরে পৃথিবীর কাছে কথা বলবে, ততদিন সেলিম আল দীনও আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাবেন। মঞ্চের আলো নিভে যায়। অভিনেতারা ঘরে ফিরে যান। দর্শকরা হল ছেড়ে চলে যান। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পের আলো নিভে না। সেলিম আল দীনের আলোও নিভেনি।
তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসর ক্রমে ভারতবর্ষের সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ধারার সঙ্গে বাংলার আবহমান সংস্কৃতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও লোকঐতিহ্যকে যুক্ত করে তিনি নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র নাট্যভুবন। সেই ভুবনে মানুষ কেবল চরিত্র নয়- সে ইতিহাসের বাহক, স্মৃতির ধারক, সমাজের প্রতিচ্ছবি এবং অস্তিত্বের এক গভীর প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন অধ্যাপনা। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর কাছে শিক্ষকতা কখনো কেবল জীবিকার পেশা ছিল না। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকতা এবং শিল্পীর সাধনা তাঁর জীবনে পাশাপাশি চলেছে। একদিকে তিনি নতুন নতুন নাটক লিখেছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৮৬ সালে তাঁর উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি এই বিভাগকে শুধু একটি একাডেমিক বিভাগে সীমাবদ্ধ রাখেননি; একে করে তুলেছিলেন নাট্যশিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে একটি স্বতন্ত্র পরিসর প্রয়োজন, সেলিম আল দীন তা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন।
তাঁর আরেকটি বড় স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের নাটককে রাজধানী বা শহরের মঞ্চে আবদ্ধ না রেখে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৮১-৮২ সালে দেশব্যাপী গড়ে ওঠে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। এর আগে আজীবনের শিল্পসঙ্গী নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঢাকা থিয়েটার। বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যচর্চার ইতিহাসে এই উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
সেলিম আল দীনের লেখকজীবনের শুরু অবশ্য আরও আগে। ১৯৬৮ সালে কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর ‘নিগ্রো সাহিত্য’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম বেতার নাটক ‘বিপরীত তমসায়’। ১৯৭০ সালে আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘লিব্রিয়াম’ প্রচারিত হয়। ১৯৭২ সালে ‘বহুবচন’-এর প্রযোজনায় মঞ্চে আসে তাঁর প্রথম নাটক ‘সর্প বিষয়ক গল্প’।
এরপর শুরু হয় এক বিস্ময়কর যাত্রা। একটি নাটক থেকে আরেকটি নাটকে তিনি যেন নিজেরই তৈরি সীমানা ভেঙে ফেলেছেন। একবার যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, পরেরবার তার ভেতর নতুন সুর খুঁজেছেন। যে আঙ্গিককে একবার আশ্রয় করেছেন, পরবর্তী সৃষ্টিতে সেটিকেই অতিক্রম করেছেন। ফলে সেলিম আল দীনের নাট্যভুবন কখনো স্থির কোনো জলাশয় নয়; বরং তা বহমান নদী- যার বাঁক আছে, স্রোত আছে, ভাঙন আছে, নতুন ভূখণ্ড সৃষ্টির প্রবল আকাঙ্ক্ষা আছে।
শুরুতে বিদেশি নাট্যধারার অনুপ্রেরণা তাঁর সৃষ্টিতে থাকলেও খুব দ্রুত তিনি সেই প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসেন। ফিরে যান বাংলার মধ্যযুগীয় নাট্যরীতি, লোকঐতিহ্য, পালাগান, কাহিনি, আখ্যান ও মানুষের জীবনসংলগ্ন শিল্পভাষার কাছে। তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা নয়। বরং নিজের মাটির গভীরে যত বেশি প্রবেশ করা যায়, বিশ্বমানবতার কাছে পৌঁছানোর পথ ততই প্রশস্ত হয়।
তাঁর নাটকের মানুষগুলো তাই প্রান্তিক। ভাঙা মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, লাঞ্ছিত নারী, নিঃস্ব মানুষ, সামাজিকভাবে অবদমিত মানুষ—তাঁদেরই জীবন তাঁর নাটকের প্রধান উপাদান। কিন্তু তাঁদের তিনি করুণার পাত্র করে দেখেননি। বরং তাঁদের জীবন, ভাষা, স্বপ্ন, বেদনা, যৌনতা, ক্ষুধা, বিশ্বাস, প্রতিরোধ ও অস্তিত্বের জটিলতাকে তিনি শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন।
‘জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘বনপাংশুল’, ‘প্রাচ্য’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’—প্রতিটি নাটক যেন তাঁর সৃষ্টিশীল অভিযাত্রার আলাদা আলাদা মাইলফলক। ‘কিত্তনখোলা’-য় আমরা দেখতে পাই লোকজীবনের গভীর স্রোত; ‘কেরামত মঙ্গল’-এ লোকঐতিহ্য ও মানুষের অস্তিত্বের বহুমাত্রিকতা; ‘চাকা’-য় মৃত্যুযাত্রার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের নির্মম বাস্তবতা; ‘যৈবতী কন্যার মন’-এ নারীজীবনের জটিলতা ও অস্তিত্বের আর্তি। আর ‘হরগজ’-এর মতো রচনায় তিনি দুর্যোগ, মৃত্যু ও মানুষের অসহায়তার ভেতর দিয়ে সমাজের এক গভীর মুখ উন্মোচন করেছেন।
তাঁর নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই- তিনি মানুষকে কেবল তার সামাজিক পরিচয়ে দেখেননি; দেখেছেন তার অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে। ফলে তাঁর নাটক একই সঙ্গে লোকজ এবং আধুনিক, দেশজ এবং বিশ্বজনীন, মাটির কাছাকাছি এবং দার্শনিক।
সেলিম আল দীন পাশ্চাত্য শিল্পের প্রচলিত বিভাজনকে প্রশ্ন করে বাঙালির সহস্র বছরের নন্দনতত্ত্বের আলোকে একটি নতুন শিল্পদৃষ্টির কথা বলেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। তাঁর এই শিল্পভাবনায় নাটক কেবল নাটক হয়ে থাকবে না; তার সঙ্গে মিশে যাবে কবিতা, উপন্যাস, সংগীত, চিত্রকলা, লোককাহিনি ও আখ্যানের নানা উপাদান। তিনি নিজেও তাঁর শিল্পকে কোনো একটি অভিধায় আবদ্ধ করতে চাননি। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল- শিল্প যেন নাটকের প্রচলিত সীমা ভেঙে অন্য সব শিল্পতীর্থের দিকে যাত্রা করে।
এই কারণেই সেলিম আল দীনের নাটক পড়তে গেলে কখনো মনে হয় আমরা নাটক পড়ছি, আবার কখনো মনে হয় কোনো দীর্ঘ মহাকাব্যের অংশবিশেষ পাঠ করছি। কোথাও কবিতার আবেশ, কোথাও উপন্যাসের বিস্তার, কোথাও লোককথার সরলতা, কোথাও আবার ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। তাঁর আখ্যানধর্মী নাট্যরীতি বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছে।
তিনি মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশের একমাত্র বাংলা নাট্যকোষেরও তিনি প্রণেতা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকে কেন্দ্র করে এথনিক থিয়েটারের যে ধারণা, তার বিকাশেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর ‘চাকা’ চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেছে। ‘হরগজ’ সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ভারতের নাট্যদল রঙ্গকর্মী হিন্দি ভাষায় তা মঞ্চস্থ করেছে। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নাটক পাঠ্য হয়েছে। অর্থাৎ যে নাট্যকার বাংলার প্রত্যন্ত মানুষের জীবন থেকে তাঁর শিল্পের উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই শিল্পই পাড়ি দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরে।
টেলিভিশনেও তাঁর অবদান সমান উজ্জ্বল। ‘রক্তের আঙুরলতা’, ‘অশ্রুত গান্ধার’, ‘গ্রন্থিকগণ কহে’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘অনৃত রাত্রি’, ‘ছায়াশিকারী’, ‘রঙের মানুষ’, ‘নকশীপাড়ের মানুষেরা’, ‘প্রত্মনারী’, ‘হীরাফুল’সহ অসংখ্য নাটক তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তারকে জানান দেয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, গভীর সাহিত্যবোধ ও গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা পরস্পরের পরিপন্থী নয়।
সেলিম আল দীন তাঁর সৃষ্টির স্বীকৃতিও পেয়েছেন বহুবার। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি। ২০২৩ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশে-বিদেশে বহুবার সংবর্ধিত হয়েছেন। কিন্তু পুরস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিই কি একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয়?
সম্ভবত নয়। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর সৃষ্টির দীর্ঘ জীবন। যে শিল্পী মৃত্যুর পরও পাঠকের কাছে ফিরে আসেন, নতুন প্রজন্মের শিল্পীকে প্রশ্ন করেন, গবেষককে নতুন অনুসন্ধানের পথ দেখান এবং সমাজকে তার নিজের মুখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন- তিনিই প্রকৃত অর্থে অমর।
সেলিম আল দীন সেই অর্থে অমর। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি মর্ত্যের মায়া ত্যাগ করে চলে যান অনন্তলোকে। বয়সের হিসাবে তাঁর জীবন দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনের দৈর্ঘ্য ক্যালেন্ডারে মাপা যায় না। তাঁদের জীবন মাপতে হয় তাঁরা কতখানি সময়কে স্পর্শ করেছেন, কত মানুষের চেতনায় প্রবেশ করেছেন, কত প্রজন্মের জন্য কতখানি আলো রেখে গেছেন- তার হিসাব দিয়ে।
সেলিম আল দীনের জীবনও তেমন। মাটির তৃণ থেকে আকাশের নক্ষত্র পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক কী, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কী, মানুষ তার ইতিহাস ও স্মৃতির কাছে কতখানি দায়বদ্ধ- এসব প্রশ্ন তাঁকে আমৃত্যু তাড়িত করেছে। তাঁর নাটকের মানুষ তাই শুধু মঞ্চের মানুষ নয়; তারা আমাদেরই পূর্বপুরুষ, আমাদেরই প্রতিবেশী, আমাদেরই ভেতরের কোনো অন্ধকার কিংবা আলো।
সেলিম আল দীনের রচনা বারবার পড়লে মনে হয়, আমরা যেন একই বই পড়ছি না; প্রতিবারই নতুন একটি দরজা খুলছে। একবার সেখানে পাওয়া যায় মানুষের দুঃখ, আরেকবার ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস, কখনো প্রেম, কখনো কামনা, কখনো ক্ষুধা, কখনো মৃত্যুভয়, আবার কখনো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাঁর রচনার এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করার শক্তি দিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক অর্জন হিসেবে সেলিম আল দীনের আবির্ভাবকে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি মানচিত্র কিংবা একটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়। স্বাধীনতার গভীরতম অর্থ হলো- নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার, নিজের ইতিহাসকে নিজের চোখে দেখার অধিকার, নিজের সংস্কৃতিকে নিজের মতো করে প্রকাশ করার অধিকার।
সেলিম আল দীন সেই সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারই এক শক্তিমান শিল্পভাষ্যকার। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বিশ্বমানের হতে হলে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় না। বরং নিজের মাটিকে যত গভীরভাবে জানা যায়, বিশ্বমানবতার সঙ্গে সংযোগ তত দৃঢ় হয়। বাংলার লোকজীবন, প্রান্তিক মানুষ, নদী-নালা, মেলা-পার্বণ, লোককথা, পুরাণ, স্মৃতি ও ইতিহাসকে তিনি যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা বাংলা নাটককে শুধু সমৃদ্ধ করেনি; বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কেও নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন নাট্যকারকে স্মরণ করা নয়। বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া। মনে করা- একটি জাতির আত্মপরিচয় তার অর্থনীতিতে যেমন, তার ভাষায়ও; তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেমন, তার শিল্পেও; তার নগরসভ্যতায় যেমন, তার লোকজ স্মৃতিতেও।
সেলিম আল দীন আমাদের সেই স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যান। বাংলা নাটকের যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজকের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে সেলিম আল দীনের পদচিহ্ন কোনো সাধারণ পদচিহ্ন নয়। তিনি যেন সেই পথের এক প্রস্তরফলক-যার ওপর লেখা আছে, নিজের মাটিকে ভুলে বিশ্বজয় করা যায় না।
তাঁর শিল্প আমাদের জন্য শুধু উত্তরাধিকার নয়, দায়িত্বও। ঔপনিবেশিকতার অবশেষ, সাংস্কৃতিক অনুকরণ এবং আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য ও শিল্পকে নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব নন্দনতত্ত্বের শক্তিতে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরাই হতে পারে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। কারণ সেলিম আল দীন আমাদের যে পথ দেখিয়েছেন, সেটি কোনো বন্ধ রাস্তা নয়; বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অন্তহীন পথ।
তিনি নেই। কিন্তু তাঁর নাটকের মানুষগুলো আছে। তাঁদের কণ্ঠ আছে। তাঁদের কান্না আছে। তাঁদের স্বপ্ন আছে। তাঁদের জীবন আছে। আর যতদিন বাংলার মাটিতে মানুষ তার নিজের গল্প বলতে চাইবে, যতদিন বাংলা ভাষা তার নিজস্ব সুরে পৃথিবীর কাছে কথা বলবে, ততদিন সেলিম আল দীনও আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাবেন।
মঞ্চের আলো নিভে যায়। অভিনেতারা ঘরে ফিরে যান। দর্শকেরা হল ছেড়ে চলে যান। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পের আলো নিভে না। সেলিম আল দীনের আলোও নিভেনি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/এএসএম
বিজ্ঞাপন