বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে ৯ জনের প্রাণনাশের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি মূল স্পটে ঢুকতেই পারছে না। জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র ঝুঁকি থাকায় বাইরে অপেক্ষা করছে তদন্তকারী দল। ফলে গ্যাসের উৎস কোথায় ছিল, জাহাজ কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মিলছে না।
জাহাজের অভ্যন্তরের বিষাক্ত গ্যাস নিরাপদে নিষ্কাশন না হওয়া পর্যন্ত সরেজমিন তদন্তও সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত যেখানে, সেই জায়গাটিই এখনো তদন্তকারীদের নাগালের বাইরে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শাখা আট সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করেছে। এতে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং মেরিন সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আদেশে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসীর আরাফাত খান, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জহির উদ্দিন, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মো. আরাফাত হোসেন এবং মেরিন সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
সীতাকুণ্ড শিপইয়ার্ড / বিষাক্ত গ্যাসে নিহত বেড়ে ৮, আশঙ্কাজনক অনেকে
জাহাজটি আমদানি করার সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ে দেওয়া নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি নির্মাণ করা হয়। জাহাজটির মূল নাম এইচএস রাস লাফফান। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এমভি রাসি।
নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত জাহাজভাঙা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ২৬ জুন কার্যকর হয় হংকং কনভেনশন। এই কনভেনশন অনুযায়ী, জাহাজ রপ্তানিকারক এর আমদানিকারককে অবশ্যই জাহাজের আইএইচএম তালিকা দেবে। এমভি রাসির আইএইচএম তৈরি করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটিজফট এশিয়া পিটিই লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আইএইচএম তৈরি করা হয়েছিল মূলত সরেজমিন পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং জাহাজটি সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।
জাহাজের প্রকৃত মালিকানা লুকিয়ে কিছু কোম্পানি ফ্ল্যাগ পরিবর্তন করে এসব জাহাজ কিনে নেয় এবং বাংলাদেশের ইয়ার্ডে বিক্রি করে। এদের বলা হয় ‘ক্যাশ বায়ার’। তারা আইএইচএম সদৃশ একটা নথি জমা দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ে, যাতে বর্জ্যসংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য থাকে না।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে ৯ জনের প্রাণনাশের ঘটনায় গঠিত তদন্তকারী পাঁচ সদস্যের পর্যবেক্ষক দল দিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু হলেও জাহাজের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা বিবেচনায় পরে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিম করা হয়। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাউকে জাহাজের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে মূল স্পটে প্রবেশ সম্ভব না হলেও পারিপার্শ্বিক তথ্য, নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
তবে সবার নজর এখন আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিমের দিকে। সরেজমিন প্রবেশ, এই দুই ধাপ পেরোলেই খুলতে পারে ফেরদৌস শিপইয়ার্ড ট্র্যাজেডির মূল রহস্যের দরজা।
আরও পড়ুন
‘আর কেউ বলবে না ভাত খেতে আসো’ দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে গিয়েছি, কিন্তু জাহাজের ভেতরের বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রটা এতটাই বেশি যে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে দুর্ঘটনার চারদিন পার হয়ে গেলেও এখনো রহস্যজনক কারণে মামলা হয়নি।
সোমবার বিকেলে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাটি ঘটলেও রোববার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মামলা করার কথা থাকলেও তারা কেউ আসেনি। তিনি নিজেও যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু নিহতের পরিবারগুলোর কেউ আসেনি।
এম মাঈন উদ্দিন/এফএ/এএসএম
বিজ্ঞাপন