বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই এখন একটি পরিবর্তন সহজেই চোখে পড়ে। তা হলো ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের উপস্থিতি বেশি। আমাদের বিভাগে মোট ভর্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছাত্রী। কোনো কোনো ব্যাচে এই অনুপাত প্রায় ৩০:৭০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ক্লাসে মাঝেমধ্যে মজা করে বলি, এই ধারা অব্যাহত থাকলে হয়তো একদিন ছাত্রদের জন্যও কোটার দাবি উঠতে পারে।
এই মজার মন্তব্যের আড়ালে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের হার এবং ফলাফলে তাদের ধারাবাহিক সাফল্য এখন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ঘটে যাওয়া একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। কিন্তু শিক্ষাজীবনে এমন সাফল্যের পর কেন কর্মক্ষেত্রে এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির একটি বড় সূচক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ছিল ৫৩:৪৭। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি সমাজের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ।
শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই মেয়েদের অগ্রগতি দৃশ্যমান। গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ছিল ৬২.৯৭ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের ছিল ৫৪.৬০ শতাংশ। এই সাফল্য বাল্যবিবাহ কমাতে ভূমিকা রাখছে এবং নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। একসময় পুরুষপ্রধান ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়গুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু এই সাফল্য কি অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। শ্রেণিকক্ষে নারীরা যতটা সফল, শ্রমবাজারে তাঁদের উপস্থিতি ততটা দৃশ্যমান নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নারীর শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ছিল ৪৬.৫৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৪২.৪০ শতাংশে। কিন্তু এর বড় অংশই পোশাকশিল্পের স্বল্প বেতনের চাকরি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে সীমাবদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক ও ভালো বেতনের চাকরিতে তাঁদের অংশগ্রহণ অনেক কম।
প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরিতেও এই বৈপরীত্য স্পষ্ট। ৪৬তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ২৯:৭১।
চিকিৎসকদের ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে এই অনুপাত ছিল ৪১:৫৯ এবং শিক্ষকদের ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ছিল মাত্র ১৭:৮৩। প্রশ্ন জাগে—উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী ও মেধার স্বাক্ষর রাখা বিপুলসংখ্যক নারী কর্মজীবনে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছেন?
তাহলে তো নারীদের উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল আমরা পাচ্ছি না।
এই প্রশ্নের উত্তর লুকানো আছে পরিবারকেন্দ্রিক যত্ন অর্থনীতির মধ্যে। সন্তান লালনপালন ও গৃহস্থালির অধিকাংশ কাজ এখনো নারীরাই করেন।
বিবিএস এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশের যৌথভাবে তৈরি ‘হাউসহোল্ড প্রোডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজের আর্থিক মূল্য ছিল জিডিপির ১৮.৯ শতাংশের সমান, যার ৮৫ শতাংশই নারীদের অবদান। অথচ প্রচলিত শ্রমশক্তির হিসাবে এর স্থান নেই।
অনেক নারী চাকরি ছেড়ে দেন কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষার সহায়তার অভাবে। একক পরিবার বাড়ায় ছোট শিশুদের দেখাশোনার মানুষের অভাব দেখা দিয়েছে, যা মায়েদের কর্মদক্ষতায় প্রভাব ফেলে। শিক্ষিত নারীদের শ্রমবাজারে কাজে লাগাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে শিশুযত্ন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে।
নারীরা বাড়ির কাছাকাছি কর্মস্থল ও নমনীয় সময়কে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই বাড়ি থেকে কাজ (work from home), খণ্ডকালীন চাকরি এবং হাইব্রিড কর্মব্যবস্থার সম্প্রসারণ নারীদের পারিবারিক দায়িত্ব সামলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ করে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতাও একটি বাধা। যৌথ কর্মপরিবেশ নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতি হলেও আরও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। নমনীয় কর্মব্যবস্থা সামাজিক বাধা দূর করে উচ্চশিক্ষার অর্থনৈতিক সুফল বাড়াতে পারে।
পাশাপাশি নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টিও ভাবতে হবে। হয়রানি ও অনিরাপদ গণপরিবহন নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত। ঢাকা মেট্রোরেলে নারীদের পৃথক কামরা সংরক্ষণ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। প্রধান অফিস এলাকাগুলোকে নিরাপদ যোগাযোগের আওতায় আনা সম্ভব হলে আরও বেশি শিক্ষিত নারী শ্রমবাজারে অংশ নেবেন।
বাংলাদেশ সরকার নারীদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা শ্রেণিকক্ষে স্পষ্ট। কিন্তু শিক্ষা একা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আনে না। এখন সময় শিক্ষাকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপান্তর করার। দেশের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুফল নির্ভর করবে শিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, টিকে থাকা ও নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছেন কি না—তার ওপর।
• বখতিয়ার উদ্দিন: অধ্যাপক ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় bakhtiareco@gmail.com
• আব্দুল্লাহ আল মামুন: অধ্যাপক, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় mamun@ru.ac.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>