বিজ্ঞাপন
বিশ্বজুড়ে র্যামের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। গত ১৮ মাসে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন ও ট্যাবের গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি বাজারে পরিস্থিতিটিকে অনেকে ‘র্যামপোক্যালিপস’ বলছেন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য বিপুল পরিমাণ মেমোরির চাহিদা।
র্যাম বা র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি কম্পিউটারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। প্রসেসরের দ্রুত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সাময়িকভাবে ধরে রাখে এটি। ফলে কোনো যন্ত্রে র্যামের পরিমাণ বেশি হলে একই সময়ে বেশি তথ্য নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়।
বিশ্বের অধিকাংশ র্যাম তৈরি করে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান-স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন। সাধারণ কম্পিউটার ও মোবাইল ডিভাইসে ব্যবহৃত ডিআরএএমের পাশাপাশি উচ্চক্ষমতার এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত হয় এইচবিএম বা হাই ব্যান্ডউইডথ মেমোরি।
সমস্যা হচ্ছে, ডিআরএএম ও এইচবিএম আলাদা প্রযুক্তি হলেও দুটির উৎপাদনে একই ধরনের সিলিকন ওয়েফার ও উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজন। মাইক্রনের প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় মেহরোত্রার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি এইচবিএম ইউনিট তৈরিতে সাধারণ ডিডিআর৫ র্যামের তুলনায় প্রায় তিন গুণ ওয়েফার প্রয়োজন হয়। ফলে এআই ডাটা সেন্টারের জন্য এইচবিএম উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সাধারণ র্যামের সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
রাস্তা কাটা-খানাখন্দ, গাড়ি চালানোর সময় যা খেয়াল রাখবেন
কয়েক গুণ বেড়েছে দাম
বাজারের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। পিসিপার্টপিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে ১৬ গিগাবাইটের দুটি ডিডিআর৫ র্যামের দাম ১০০ ডলারের নিচে ছিল। বর্তমানে একই ধরনের র্যামের দাম ৪০০ ডলারের বেশি। উচ্চগতির ৩২ গিগাবাইট ডিডিআর৫ র্যামের দামও একসময় ২৫০ ডলারের নিচে থাকলেও এখন তা ১ হাজার ২০০ ডলারের বেশি। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে একটি ভালো মানের র্যামের দাম দিয়ে একটি ল্যাপটপও কেনা সম্ভব।
এআই ডাটা সেন্টারে বিপুল চাহিদা
এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণই র্যামের বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে। এআই প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুলসংখ্যক গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ ব্যবহার করে ডাটা সেন্টার তৈরি করছে। এসব অবকাঠামোতে বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতার মেমোরি প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের মেমফিসের ‘কলোসাস’ ডাটা সেন্টারে কয়েক লাখ জিপিইউ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এসব যন্ত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় র্যাম ব্যবহার করা হলে শুধু একটি ডাটা সেন্টারেই বিপুল পরিমাণ মেমোরি প্রয়োজন হতে পারে। এদিকে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরেও র্যামের চাহিদা কমার সম্ভাবনা কম।
কবে কমবে র্যামের দাম?
এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, র্যামের দাম কবে স্বাভাবিক হবে। বরং বড় মেমোরি নির্মাতাদের বক্তব্যে দ্রুত দাম কমার আশাবাদ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
এসকে হাইনিক্সের প্রধান নির্বাহী কোয়াক নোহ-জুং মনে করছেন, ২০২৭ সালেও পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে এবং ২০৩০ সালের পরও চাহিদা সরবরাহের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। মাইক্রনের প্রধান নির্বাহীও ২০২৭ সালের পর পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ সংকট থাকার আশঙ্কা জানিয়েছেন। ডেলয়েটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের আগে বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি নাও আসতে পারে।
নতুন কারখানা তৈরি করতেও সময় লাগবে
চাহিদা বেড়ে গেলেই রাতারাতি র্যামের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। নতুন মেমোরি কারখানা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এসব কারখানা তৈরি করতে হয়।
এসকে হাইনিক্স দক্ষিণ কোরিয়ায় দুটি নতুন মেমোরি কারখানা তৈরিতে প্রায় ৩৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। তবে এসব কারখানায় উৎপাদন শুরু হতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর মধ্যে নির্মাতাদের কাছে উচ্চক্ষমতার এইচবিএম তুলনামূলক বেশি লাভজনক। এআই প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব মেমোরির জন্য বেশি অর্থ দিতে প্রস্তুত। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ব্যবহৃত র্যামের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্মাতাদের আগ্রহ তুলনামূলক কম।
আরও পড়ুন
অ্যাপল থ্রেড নোটিফিকেশন কী? সতর্কবার্তা এলে যা করবেন
এখনই র্যাম কিনবেন?
বিশ্লেষকদের মতে, প্রয়োজন না থাকলে আতঙ্কিত হয়ে র্যাম কিনে মজুত করার দরকার নেই। এতে বাজারের সংকট আরও বাড়তে পারে। তবে আগামী কয়েক বছর যদি কারো র্যাম আপগ্রেড করার প্রয়োজন থাকে, তাহলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিকল্পনা করে কেনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কারণ স্বল্পমেয়াদে দাম কমার নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে বা নতুন উৎপাদন সক্ষমতা বাজারে এলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেও যেতে পারে।
অর্থাৎ র্যামের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সরবরাহ নয়, এআইয়ের বিপুল চাহিদার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মেমোরি উৎপাদন কত দ্রুত তাল মেলাতে পারে-সেটিই।
শাহজালাল/কেএসকে
বিজ্ঞাপন