জাতীয়

দুই দশকে সিলেটে তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
7 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
সকালে বৃষ্টি, দুপুরে তীব্র গরম। কখনো টানা বৃষ্টিতে ডুবে যায় নগর থেকে শুরু করে হাওর ও বিস্তীর্ণ এলাকা। আবার বৃষ্টিহীন সময়ে কাঠফাটা রোদে পুড়ে যায় সব। অসহনীয় গরমে জনজীবনে অস্বস্তি ও হাঁসফাঁস অবস্থা সৃষ্টি হয়। সিলেটের প্রকৃতি ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাচ্ছে তার রূপ। প্রকৃতিতে দেখা মিলছে না গ্রীষ্ম-বর্ষার চেনা ছন্দ। সিলেটের আবহাওয়া যেন এখন নিজের নিয়মেই চলছে। কখনো ডোবাচ্ছে আবার কখনো পোড়াচ্ছে প্রকৃতিকন্যা সিলেটকে। আরও পড়ুন সিলেটে তিন ঘণ্টায় ঝরলো রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি গত দুই দশকের ব্যবধানে সিলেটে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সঙ্গে বেড়েছে বৃষ্টিপাতও। তাপ ও বৃষ্টির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বদলে যাচ্ছে সিলেটের প্রকৃতি ও পরিবেশ। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার অতিপরিবর্তনে সিলেট শহর এখন ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে গেছে। ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা শোষণ করার জায়গা নেই। নগরে গড়ে ওঠা উঁচু উঁচু দালান ও এসিগুলোর আউটডোর বাইরে থাকায় সবসময় তাপমাত্রা গরম থাকছে। দুই দশকে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি সিলেটে গত দুই দশকের ব্যবধানে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় সাত বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় প্রায় ৩৮ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ এই দুই দশকের ব্যবধানে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সিলেট আবহাওয়া অফিসের রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২০২২ সালে ৩৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরও পড়ুন ৫ দিন কেমন থাকবে বৃষ্টিপাত, যা জানালো আবহাওয়া অফিস আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২০ সালে সিলেটের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২১ সালে ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি, ২০২২ সালে ৩৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি, ২০২৩ সালে ৩৮ ডিগ্রি, ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ২০২৫ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়াও চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গত মাসে রেকর্ড করেছে সিলেট আবহাওয়া অফিস। অন্যদিকে ২০০৬ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা কাজে ব্যবহৃত ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের সিলেট আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০১ সালে সিলেটের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০২ সালে ৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি, ২০০৩ সালে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি, ২০০৪ সালে ৩৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি ও ২০০৫ সালে ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলবায়ুর অতিপরিবর্তনে সিলেট এখন ‘হিট আইল্যান্ড’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার অতিপরিবর্তনে সিলেট শহর এখন ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে গেছে। ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা শোষণ করার জায়গা নেই। নগরে গড়ে ওঠা উঁচু উঁচু দালান ও এসির আউটলেট বাইরে থাকায় সবসময় তাপমাত্রা গরম থাকছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে। সিলেটও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে সিলেটে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেশি গরমও অনুভূত হচ্ছে। কারণ সিলেটের বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মাটিতে যে সূর্যের আলো পড়ে তা জলাভূমি ও গাছপালা কিছুটা শোষণ করে নেয়। কিন্তু জলাভূমি ধ্বংস ও গাছপালা কেটে ফেলায় সেই তাপমাত্রা সরাসরি ফিরে যাচ্ছে। এতে বায়ু গরম হয়ে যাচ্ছে। যখন প্রচুর মেঘের ভেতর গরম বায়ুর সংঘর্ষ হচ্ছে, তখন বজ্রপাত হচ্ছে। প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। হাওরে বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হলো স্থানীয় পরিবেশের সূর্যের আলো ধারণ করার মতো ক্ষমতা নেই। যার কারণে হিটিং ও কুলিং সিস্টেমে পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, সিলেটসহ আমাদের শহরগুলো ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে গেছে। তাপমাত্রা বসার জায়গা নেই। নগরে গড়ে ওঠা উঁচু উঁচু দালান ও এসিগুলোর আউটলেট বাইরে থাকায় সবসময় তাপমাত্রা গরম থাকছে। ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সিলেটে তাপমাত্রার অতি উষ্ণতা ও অতি নিম্নতার জন্য দায়ী মানুষের তৎপরতা। মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ভূমির তাপমাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। গত ৩০ বছরে হাওরে ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। হাওর রক্ষা বাঁধের নামে হাওরগুলোকে ছোট ছোট পুকুর করে ফেলা দেওয়া হয়েছে। যত্রতত্র ব্রিজ, সড়ক নির্মাণ ও হাওর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কারণে ভূমি ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাছাড়া নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। হাওরে হাউজবোট ব্যবহারের কারণে হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে। বৃষ্টিপাতের মৌসুমে বড় পরিবর্তন, প্রাক মৌসুমেই ঝরছে অধিক বৃষ্টি দুই দশকের ব্যবধানে সিলেটে বৃষ্টিপাত বেড়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে বছরে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ৩ হাজার ৮০৮ মিলিমিটার। আর ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় বৃষ্টিপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ মিলিমিটারে। আরও পড়ুন ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে উঠছে সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে সিলেটে ৩ হাজার ৪৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, ২০০২ সালে ৩ হাজার ৬৪০ মিলিমিটার, ২০০৩ সালে ৩ হাজার ৬৫৮ মিলিমিটার, ২০০৪ সালে ৪ হাজার ২৮০ মিলিমিটার ও ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৮৮ মিলিমিটার। অন্যদিকে ২০২০ সালে সিলেটে ৪ হাজার ২২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পরের বছর ২০২১ সালে ৩ হাজার ৩০৯ মিলিমিটার, ২০২২ সালে ৫ হাজার ১১৮ মিলিমিটার, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৩৩৭ মিলিমিটার, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ১৮৫ মিলিমিটার ও ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩৩৬ মিলিমিটার, সর্বশেষ চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৮৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে সিলেট আবহাওয়া অফিস। অন্যদিকে ২০০১ থেকে ২০০৫ এবং ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের বৃষ্টিপাত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমের মতো প্রাক-বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টিপাত বাড়ছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে প্রাক বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ মার্চ থেকে মে মাসে বৃষ্টিপাতের গড় ছিল ১ হাজার ৭২০ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৭ মিলিমিটারে। শাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেটে বৃষ্টিপাতের কারণ হলো উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু। এই বায়ু বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প বহন করে নিয়ে আসে। মেঘালয় পাদদেশে ঘনীভবন ঘটিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। তিনি বলেন, মৌসুমী বায়ু কত আগে আসবে সেটা নির্ভর করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতার ওপর। সমুদ্রপৃষ্ঠ মার্চ-এপ্রিল মাসে প্রচুর সূর্যালোক গ্রহণ করে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প দেয়। সেই জলীয় বাষ্প বাতাসে নিয়ে এসে আমাদের এখানে বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। মৌসুমী বায়ু আগে ভাগে চলে আসায় সিলেটে আগাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এফএ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>