বিজ্ঞাপন
চার দশকে ১১ জনের প্রাণহানি
মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুরের নৌপথ দিয়ে আসে কাঁচামাল
অর্থের জোগানদাতাদের একজন প্রবাসী
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়ন। এখানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত দীর্ঘদিনের। এই সংঘাতের অন্যতম ভয়ংকর অস্ত্র হাতবোমা। গত এক চার দশকে বোমা বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে অন্তত ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কমপক্ষে ২৫ জন। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও বোমা বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে তিনজনের। এরপরও থামেনি বিস্ফোরণ।
কখনো কবরস্থান, কখনো বসতবাড়ির সেপটিক ট্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মিলছে বোমার অস্তিত্ব। মূলত বোমা তৈরিতে অর্থের জোগান, মামলা হলেও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তে ধীরগতির কারণে অপরাধীদের সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ড থামছে না। ফলে সহসাই কমছে না এই বোমাবাজি।
আরও পড়ুন
শহরজুড়ে বোমা আতঙ্ক, শেষে বাজল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
সংঘাতের প্রধান অস্ত্র বোমা
জাজিরার বিলাসপুর ইউনিয়নটি পদ্মা নদী লাগোয়া। একদিকে রয়েছে মুন্সিগঞ্জ, অপরদিকে চাঁদপুর। মূলত ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে বিরোধ, জেগে ওঠা চরের জমি দখলে নেওয়া, পদ্মা নদীর নৌপথ নিয়ন্ত্রণ, বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণসহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সহিংসতা লেগেই আছে।
‘এই অঞ্চলের বোমা তৈরির কাঁচামাল মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুরের নৌপথ দিয়ে আসে। কিছু মালামাল মাদারীপুর থেকে সড়ক পথে আসে। পদ্মার চর, বাগান ও পরিত্যক্ত ঘরে বসে এসব বোমা তৈরি করা হয়। এসব তৈরিতে তারকাটা, নৌকার পাতাম, মার্বেল ও বিশেষ ধরনের বলিবন্দ বারুদ ব্যবহার করা হয়। যা কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটলে মানুষের মৃত্যু ও অঙ্গহানি ঘটে’—বোমা তৈরির কারিগর
শুরুটা হয়েছিল চার দশক আগে বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মাদবর ওরফে মেছের মাস্টার ও আরেক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার মাদবরের মধ্যে। একটি হত্যা মামলায় মেছের মাস্টার যাবজ্জীবন সাজাভোগ শেষে বের হলে কয়েক মাস পর মারা যান। তখন তার দলটি পরিচালনা করেন তারই চাচাতো ভাই সোবহান মাস্টার।
অন্যদিকে আনোয়ার মাদবরের দলের নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কুদ্দুস বেপারী। পরে সোবহান মাস্টারের দলের নেতৃত্ব দেন পরাজিত চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জলিল মাদবর। নতুন এই নেতৃত্বে তাদের সমর্থকরা দুটি আলাদা বাহিনি গড়ে তুলেছেন। এই বাহিনীর দুটির সদস্যরা ককটেল তৈরি করা, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করে লুটপাট, সংঘর্ষে জড়ানো ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সূত্র বলছে, এই দুই পক্ষে আছে ককটেল তৈরি ও বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষিত লোক। বিলাসপুরে তৈরি এসব ককটেল এই ইউনিয়নের বাইরেও বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়ন ও সীমানা লাগোয়া কয়েকটি জেলায়ও সংঘর্ষের ঘটনায় বিলাসপুর থেকে এসব হাতবোমা সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, সংঘাতকে কেন্দ্র করে বোমা তৈরির জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়। সেই অর্থে স্থানীয় কিছু যুবককে ব্যবহার করে তৈরি করা হয় হাতবোমা। বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত এমন কয়েকজনের বক্তব্যও পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
সাভারে বোমা উদ্ধার / নব্য জেএমবির সদস্য আরিফ ৬ দিনের রিমান্ডে
সম্প্রতি মুলাই বেপারি কান্দি এলাকায় গিয়ে কথা হয় হাতবোমা তৈরির কারিগর দুই তরুণের সঙ্গে। তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এরা দেখে দেখে বোমা তৈরির কাজ রপ্ত করেছেন। এদের মধ্যে একজনের দাবি, হাতবোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে চোখের সামনে তার এক স্বজনের মৃত্যু হলে তিনি এসব থেকে সরে এসেছেন। তবে এই বয়সেই তার ওপর রয়েছে বিস্ফোরক দ্রব্য, মারামারিসহ অন্তত ৯টি মামলা।
পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে হাতবোমা ব্যাপারে বেশকিছু চমকপ্রদ তথ্য দেন এই কারিগর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই অঞ্চলের বোমা তৈরির কাঁচামাল মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুরের নৌপথ দিয়ে আসে। কিছু মালামাল মাদারীপুর থেকে সড়ক পথে আসে। পদ্মার চর, বাগান ও পরিত্যক্ত ঘরে বসে এসব বোমা তৈরি করা হয়। এসব তৈরিতে তারকাটা, নৌকার পাতাম, মার্বেল ও বিশেষ ধরনের বলিবন্দ বারুদ ব্যবহার করা হয়। যা কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটলে মানুষের মৃত্যু ও অঙ্গহানি ঘটে।’
‘আসলে আমাদের এলাকার এই মারামারি থামার নয়। কেননা বাইরে থেকে বেশ কিছু লোক অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। সেই টাকা দিয়ে মানুষজন আধিপত্য বিস্তার করতে সংঘর্ষে জড়ায়। প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তারা যদি সঠিকভাবে উদ্যোগ নিত, তাহলে এই সংঘর্ষ-বোমাবাজি ঠেকানো যেত’—ভুক্তভোগী
এই কারিগরের ভাষ্যমতে, এককেজি বারুদে ১০টি বোমা তৈরি করা যায়। পারিশ্রমিক দেওয়া হয় দুই হাজার টাকা। এক ঘণ্টায় কমপক্ষে ১০০ পিস বোমা বানানো সম্ভব। সারাদিন বোমা তৈরি করলে দিনে পাঁচ লাখ টাকাও আয় করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘এসব কালো টাকা বেশি থাকে না। আর এ কাজে অনেক মৃত্যুঝুঁকি আছে। আমার বড় ভাই আমাকে বোমা তৈরির সময় ফিরাতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটলে আমার চোখের সামনেই মারা যায়। সেই থেকে আমি বোমা বানানো ছেড়ে দিয়েছি।’
বোমা তৈরির এই কারিগর বলেন, পুলিশ চাইলে বোমাবাজি যেকোনো মুহূর্তে থামানো সম্ভব। কিন্তু তারা অভিযানের আগেই থানা থেকে খবর দিয়ে দেন, যাতে মামলার আসামিরা পালিয়ে যান।
কথা হয় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়া মেহের আলী মাদবর কান্দি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মোল্লার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অন্তত সাতজন আছেন, যাদের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অঙ্গহানি হয়েছে। কারও হাত উড়ে গেছে, কারও পা উড়ে গেছে, কারও আবার বিভিন্ন স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।’
নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মজিবুর রহমান বলেন, ‘২০১২ সালে সংঘর্ষের সময় আমার সামনে হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এসময় আমি আমার মাথা রক্ষা করার সময় একটা হাতের কব্জি উড়ে যায়। সেই থেকে প্রতিনিয়ত আমি অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। মাঝে মধ্যে যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতেও পারি না।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের এলাকার এই মারামারি থামার নয়। কেননা বাইরে থেকে বেশ কিছু লোক অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। সেই টাকা দিয়ে মানুষজন আধিপত্য বিস্তার করতে সংঘর্ষে জড়ায়। প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তারা যদি সঠিকভাবে উদ্যোগ নিত, তাহলে এই সংঘর্ষ-বোমাবাজি ঠেকানো যেত।’
আরও পড়ুন
সাভারে নতুন করে ফিরছে পুরোনো জঙ্গি তৎপরতা!
আধিপত্যের লড়াইয়ে বোমার ব্যবহার
একটা সময় দুপক্ষের সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্র, টেঁটা, ঢাল, রামদা ব্যবহৃত হলেও ধীরে ধীরে সেটি বন্ধ হয়ে এখন দুই যুগ ধরে হাতবোমা ব্যবহার হয়ে আসছে। এর কারণ হাতবোমা দিয়ে সংঘর্ষে জড়াতে লোকবল কম দরকার পড়ে। দূর থেকেই নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুদ্দুস বেপারী ও জলিল মাদবরের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, হত্যা, মারামারিসহ অন্তত অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। জলিল মাদবর দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। সম্প্রতি কুদ্দুস বেপারীকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে শীর্ষ পর্যায়ের এই দুজন গ্রেফতার থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত এবং বোমাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
‘আমি আমার জন্মের পর থেকেই এসব মারামারি দেখছি। বোমাবাজি শুরু হয়ছে ২০ থেকে ২২ বছর ধরে। জানুয়ারি মাসেও বোমা বিস্ফোরণে তিনজন মারা গেছে। তারপর প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নিলো না। এখনো কবরস্থানে, বাগানে বোমা বিস্ফোরণ হয়’—স্থানীয় বাসিন্দা
এই দুজনের অবর্তমানে কুদ্দুস বেপারীর গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কুদ্দুস বেপারীর বড় ভাই ইদ্রিস বেপারী, ছিদম বেপারী, নুর ইসলাম বেপারী, নুরুজ্জামান সরদার, রোমান বেপারী। অন্যদিকে, জলিল মাদবরের গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যুৎ মাদবর, কামাল মাদবর, মজিবুর মোল্লা, জামাল খান ও স্বপন খান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালানোর আগেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযানের খবর অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তারা গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ পান। বিভিন্ন স্থানে বোমা থাকার তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি আমার জন্মের পর থেকেই এসব মারামারি দেখছি। বোমাবাজি শুরু হয়ছে ২০ থেকে ২২ বছর ধরে। জানুয়ারি মাসেও বোমা বিস্ফোরণে তিনজন মারা গেছে। তারপর প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নিলো না। এখনো কবরস্থানে, বাগানে বোমা বিস্ফোরণ হয়।’
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমাদের বাড়ির পেছনে একটি ট্যাংকে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। পুলিশ আসে, ঘুরে আবার চলে যায়। পুলিশ এসব বোমা উদ্ধারে উদ্যোগ নেয় না। প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই বোমাবাজি এখনো চলছে। আমরা এলাকায় শান্তি চাই।’
বোমার বারুদের গন্ধ পাশের ইউনিয়নেও
গত ২৯ মে জাজিরা উপজেলার সেনেরচর ইউনিয়নের চরধুপুরীয়া চরকান্দি এলাকায় মরিচক্ষেত থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ককটেল বিস্ফোরণে রাহাত নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর দুই হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৯ জুলাই বিকেনগর ইউনিয়নের কদম আলী মাদবর কান্দি গ্রামের জব্বার মাদবরের বাড়ির টয়লেটের ছাদে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে টয়লেটের ছাদ ধসে পড়ে এবং ওপরের পানির ট্যাংক বিস্ফোরণের তীব্রতায় উড়ে গিয়ে অন্য স্থানে পড়ে।
‘আমাদের এই অঞ্চলে একমাত্র বোমা তৈরি হয় বিলাসপুরে। যখন পাশের ইউনিয়নগুলোতে সংঘর্ষ হয়, তখন তারা আধিপত্য বিস্তার করতে তাদের পূর্বপরিচিত বা স্বজনদের মাধ্যমে অনায়াসেই বিলাসপুর থেকে বোমা সংগ্রহ করে। এমনকি এগুলো ব্যবহারের জন্য লোকও নেয়। প্রশাসন অবশ্যই বিষয়গুলো জানে’—স্থানীয় বাসিন্দা
সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাজিরার মূলনা ইউনিয়নের লাউখোলা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এসময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় মান্নান সরদার নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। ওই ঘটনায় আরও অন্তত ১০ জন আহত হন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ইউনিয়নের বিস্ফোরিত বোমাগুলো বিলাসপুর থেকেই সরবরাহ করা হয়। অথচ বোমা বিস্ফোরণ ঠেকাতে ও বোমা নির্মূল করতে প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
কেরানীগঞ্জে ব্যর্থ হয়ে সাভারে বোমা ল্যাব, নব্য জেএমবির বড় হামলার ছক!
রিয়াদ হোসেন নামের জাজিরার এক যুবক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলে একমাত্র বোমা তৈরি হয় বিলাসপুরে। যখন পাশের ইউনিয়নগুলোতে সংঘর্ষ হয়, তখন তারা আধিপত্য বিস্তার করতে তাদের পূর্বপরিচিত বা স্বজনদের মাধ্যমে অনায়াসেই বিলাসপুর থেকে বোমা সংগ্রহ করে। এমনকি এগুলো ব্যবহারের জন্য লোকও নেয়। প্রশাসন অবশ্যই বিষয়গুলো জানে।’
‘লাউখোলা এলাকায় পর পর দুদিন বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। একজন লোক মারা গেছে, আরেকজনের হাতের কব্জি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও কীভাবে সেই এলাকায় বোমা বিস্ফোরণ হয়? আমরা চাই প্রশাসন একদম চিরুনি তল্লাশি করে প্রয়োজনে বিলাসপুরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি দিয়ে বোমাবাজি বন্ধ করুক’—যোগ করেন এই যুবক।
ইমরান আল নাজির নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘বিলাসপুরের এই সমস্যা গত ৪০ বছরের। আওয়ামী লীগ আমলের সময় দুই পক্ষকে শেল্টার দিতো সাবেক দুই এমপি (ইকবাল হোসেন অপু ও বিএম মোজাম্মেল হক)। এ কারণে প্রধান অভিযুক্তদের বিচার করা সম্ভব হতো না। তাদের একেকজনের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬০টি করে মামলা রয়েছে। কিন্তু সেই মামলার এখন পর্যন্ত কোনো রায় হয়নি, তারা সাজা পায়নি। যে কারণে তারা এমনিতেই সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের কথা হচ্ছে—এখন তো আর সাবেক এমপিরা নেই, তাহলে কেন তাদের এই বোমাবাজি বন্ধ করা যাচ্ছে না?’
মামলা নিতে গড়িমসি, তদন্তে ধীরগতি
গত চার দশকে বোমা বিস্ফোরণসহ মারামারিতে প্রাণ গেছে অন্তত ১১ জনের। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কমপক্ষে ২৫ জন। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে হত্যা, বিস্ফোরণ, মারামারি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ৬৭টি। এসব মামলার বেশিরভাগই তদন্তাধীন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে মুলাই বেপারীকান্দি এলাকার জয়নাল মোল্লার ছেলে নয়ন মোল্লা, চেরাগ আলী বেপারী কান্দি এলাকার রহিম সরদারের ছেলে নবীন হোসেন এবং দেলোয়ার হোসেন হোসেন বেপারীর ছেলে সোহান নিহত হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে কবরস্থান, বসতবাড়ির সেপটিক ট্যাংকসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর মামলা করতে গিয়েও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। পুলিশ থানায় মামলা না নিয়ে গড়িমসি করেছে। একপর্যায়ে তাদের স্বজনদের গ্রেফতার করেছে।
‘হাতবোমা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা হাতবোমা কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটলে অঙ্গহানি হয়ে যায়, অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চোখের আশেপাশে বিস্ফোরণ ঘটলে চোখের আলো চিরতরে নিভে যায়। বোমার যেই স্প্লিন্টার শরীরে ঢুকে যায়, তার কিছু অপারেশনের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হলেও কিছু স্প্লিন্টার থেকে যায়, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়’—চিকিৎসক
বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত সোহানের বোন মাজেদা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভাই যখন মারা যায়, আমরা জানি না তাকে কারা ডেকে নিয়েছিল। সে রাতের খানা খেয়ে ঘুমাইছে। এরপর সকালে শুনি আমার ভাই মারা গেছে। আমি এই ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বলে, সকালে আসেন, বিকালে আসেন—এভাবে ঘুরিয়েছে। একপর্যায়ে তারা আমাদের মামলা না নিয়ে উল্টো মামলা করেছে, যেখানে আমার আরেক ভাইকে গ্রেফতার করেছে। ভাইও মরেছে আমার, জেলও খেটেছে আবার আরেক ভাই। আমরা কোনো বিচার পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘আমার ভাইকে কবর দেওয়ার দিনও বাড়ির পেছনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এই যে তিনজন লোক মারা গেল, তারপরও কোনোভাবেই এই ককটেল অপসারণ করা হয়নি। প্রায় দিনই ককটেল ফুটছে।’
নিহতের নবীন হোসেনের মা রুবিনা জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুপক্ষ মারামারি করে। সেখানে আমাদের সন্তানদের ব্যবহার করে। ঘরেও থাকতে দেয় না। এলাকায় থাকলে দল করতে হবে। মাঝাখান থেকে আমাদের ক্ষতি হয়, আমরা সন্তানহারা হই। তাদের তো কিছুই হয় না, তারা ভালো থাকে। কেউ এসে দেখেও না আমরা কী অবস্থায় আছি!’
আরও পড়ুন
সেই ‘প্রেশার কুকার বোম’ নিষ্ক্রিয় করেছে বোম ডিস্পোজাল ইউনিট
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে মারামারিতে যেতে চায়নি। ঘরে বউ গর্ভবতী ছিল। কেউ তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। আমার ছেলে শেষবারের মতো ঘর থেকে ভাত খেয়ে বের হয়েছে। আমিতো জানতাম না এটাই আমার ছেলেকে শেষ দেখা। যেদিন আমার ছেলে মারা গেল, আমরা নিরূপায়। আমার এক ছেলে মারা গেছে, আরেক ছেলেকেও আসামি দিয়েছে পুলিশ। থানায় সেই ঘটনায় কোনো মামলা নেয়নি। তারপরও আমি চাই এ দেশটা ভালো হোক, আমার মতো সন্তানহারা যেন কেউ না হয়।’
অর্থের জোগানদাতা কারা
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিলাসপুরে হাতবোমা তৈরিতে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ইতালি প্রবাসী রাসেল খাঁনের নাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রাসেল খাঁন। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসে থেকেও নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি হাতবোমা তৈরিতে অর্থের জোগান দিয়ে যাচ্ছেন। তবে রাসেল খাঁন এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
‘বিলাসপুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এখন যে বিস্ফোরণগুলো ঘটছে, তা মূলত পূর্বে রাখা বোমা, যেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বোমাবাজির ঘটনায় জড়িতদের অনেককে আমরা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। অবশিষ্ট যারা আছে, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে বিলাসপুরকে নিরাপদ স্থান তৈরি করব’—অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার এক সদস্য বলেন, ‘জানুয়ারি মাসে তিনজন নিহতের পর থেকেই বেশ কয়েকজনের নাম অর্থ যোগানদাতা হিসেবে উঠে এসেছে। এদের মধ্যে ইতালি প্রবাসী রাসেল খাঁনের লেনদেনের বিষয়েও অবগত হয়েছি।’
এ বিষয়ে ফোনে কথা হয় রাসেল খাঁনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ২৫ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে চলে আসি। তিন বছর আগে একবার দেশে এসেছিলাম, পরে ইতালি চলে আসি। সব মিলিয়ে দেশে এক বছরের বেশি সময় ছিলাম না। তাছাড়া আমাদের সেখানে ভাই নেই যে আধিপত্য বিস্তার করবে, তাকে আমি আর্থিক সুবিধা দেব।’
‘আপনি একবার ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অংশ নিয়েছেন। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে আগামী নির্বাচনেও আপনি চেয়ারম্যান পদে লড়বেন। এজন্য আধিপত্য ধরে রাখতে বোমাবাজির ঘটনায় আর্থিক জোগান দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে’—এমন প্রশ্নের উত্তরে রাসেল খাঁন বলেন, ‘আমি যদি আধিপত্য বিস্তার ধরে রাখতে এটা করি, তাহলে দেশে এতগুলো মামলা-হামলা হলো, সেখানে আমার পরিবারের সদস্য, কাছের আত্মীয়দের কেন মামলায় আসামি করা হয়নি? আমি আরও এলাকার মানুষদের বলেছি, আপনার সন্তানদের কিছু টাকার জন্য বোমার বালতি না টানতে দিয়ে তাদের বিদেশে পাঠান, ইউরোপমুখী করেন। আমি আপনাদের সহযোগিতা করবো।’
আরও পড়ুন
মেহেরপুরে এনসিপির সমাবেশস্থল থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার
‘আগামী ইউপি নির্বাচনে অংশ নিবেন কি-না’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি অঞ্চল রয়েছে। সেখানে লোকজন যদি চায়, আমি অবশ্যই নির্বাচন অংশগ্রহণ করবো।’
ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা
বিলাসপুরের বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতার নির্মম সাক্ষী ভুক্তভোগীরা। বিস্ফোরণের সময় ছড়িয়ে পড়া স্প্লিন্টারে শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হতে পারে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ, দৃষ্টিশক্তি হারানো কিংবা স্থায়ী অঙ্গহানি। অনেকেই প্রাণে বেঁচে গেলেও সারাজীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন পঙ্গুত্ব ও শারীরিক যন্ত্রণা।
জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোমান বাদশাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাতবোমা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা হাতবোমা কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটলে অঙ্গহানি হয়ে যায়, অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চোখের আশেপাশে বিস্ফোরণ ঘটলে চোখের আলো চিরতরে নিভে যায়। বোমার যেই স্প্লিন্টার শরীরে ঢুকে যায়, তার কিছু অপারেশনের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হলেও কিছু স্প্লিন্টার থেকে যায়, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় যে রোগীগুলো আসে, তাদের অনেকের অঙ্গহানি, নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসা অবস্থায় আসে, যার চিকিৎসা এখানে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়।’
শেষ হয় না বিচার
বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলা হলেও বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো মামলায় তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতেই দীর্ঘ সময় চলে যাচ্ছে। এরপর আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াও বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।
আইনজীবীদের মতে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলার আসামিদের কেউ কেউ আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান। পরে তাদের একটি অংশ ফের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন
মেট্রোরেল স্টেশনে পাওয়া বোমা সদৃশ বস্তুতে মিললো পান-সুপারির কৌটা
শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান খান দিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিলাসপুরের ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলা তদন্তাধীন, কিছু মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আদালত সাক্ষীদের প্রসেস দিয়েছেন। কিন্তু সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না।’
তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনকে বলেছি যাতে তারা দ্রুত মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেন। সাক্ষীদের আদালতে হাজির করেন। তাহলে দ্রুত বিচার পাওয়া সহজ হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত কাদের গাফিলতিতে মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। ন্যায়বিচার না পাওয়ার কারণে বোমাবাজির ঘটনা কমছে না।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বছরের পর বছর ধরে বোমা বিস্ফোরণ, প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পুলিশ প্রশাসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, শুধু বিস্ফোরণের পর মামলা বা বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বোমা তৈরির কারিগরদের পাশাপাশি এর নেপথ্যে থাকা অর্থদাতা ও মদতদাতাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে পুলিশের দাবি, বিলাসপুরের বোমাবাজি বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনারও চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গায় ‘জয় বাংলা’ লেখা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তানভীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পদ্মা-মেঘনায় অসংখ্য চর রয়েছে। এছাড়া যেখানে কম বসতি সেখানে এসব বোমা তৈরি করা হয়। তারা ঢাকা থেকে বোমা তৈরির রসদ নদীপথে কখনো সড়কপথেও আনছেন। আমাদের জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব থাকায় মাঝেমধ্যে অভিযানে বেগ পেতে হয়। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘বিলাসপুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এখন যে বিস্ফোরণগুলো ঘটছে, তা মূলত পূর্বে রাখা বোমা, যেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বোমাবাজির ঘটনায় জড়িতদের অনেককে আমরা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। অবশিষ্ট যারা আছে, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে বিলাসপুরকে নিরাপদ স্থান তৈরি করব।’
এসআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন