বিজ্ঞাপন
রাতের আঁধারে বিদ্যুতের খুঁটির ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। দিনের পর দিন লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলেও অনেক গ্রাহক সেটিকে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটই মনে করছেন। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে ট্রান্সফরমার চোরচক্র। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার প্রত্যন্ত ও নির্জন এলাকায় একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত দেড় মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৯টি ট্রান্সফরমার চুরির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত ৩১ জুলাই দিবাগত রাতে ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নাউরি ও ফৈলাকান্দি এলাকায় পাশাপাশি স্থান থেকে এক রাতেই চারটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। সর্বশেষ ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি ও জীবগাঁওয়ে চুরি হয়েছে আরও দুটি ট্রান্সফরমার।
তবে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের হিসাব বলছে, চলতি ক্যালেন্ডার বছরে এ জোনের আওতাধীন এলাকায় মোট ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসেই ১৩টি এবং আগস্টে আরও ছয়টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুননুর জামে মসজিদের পাশের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমারটি খুলে নিয়ে যায় চোরেরা। একই রাতে জীবগাঁও গ্রামের দক্ষিণ দিকে ইব্রাহীম আখনের বাড়ির সামনের খুঁটি থেকেও একটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
ট্রান্সফরমার দুটি চুরি যাওয়ায় দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুননুর জামে মসজিদসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বাইতুননুর জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বোরহানউদ্দিন ডালি জানান, ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাওয়ায় মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে মুসল্লিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও সমস্যায় পড়েছেন। দ্রুত নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
চুরি বাড়ছে, বাড়ছে গ্রাহকের দুর্ভোগ
উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রাম, সুলতানাবাদ ইউনিয়নের দাসের বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এর আগে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ট্রান্সফরমার চুরির পর দ্রুত নতুনটি স্থাপন করা সম্ভব হলেও অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে গ্রাহকদের।
স্থানীয় গ্রাহক তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল হান্নান ও শুক্কুর আলী জানান, তাদের এলাকার অধিকাংশ মানুষই নিম্ন আয়ের। ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দিতে বলা হলে তা জোগাড় করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে টাকা জোগাড় না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, কোনো এলাকায় প্রথমবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক টাকা গ্রাহকদের বহন করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার আবার চুরি হলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১০ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর প্রায় এক লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএর প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ফলে নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তামার কয়েলের জন্যই চুরি?
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয়দের ধারণা, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা তামার কয়েল, তার ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতব অংশই চোরদের মূল লক্ষ্য। ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়ার পর সেগুলো ভেঙে আলাদা করে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম জানান, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতরা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। কারণ বিদ্যুৎ লাইনে সংযোগ থাকা অবস্থায়ও তারা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে তারা ধারণা করছে। চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর প্রত্যন্ত ও নির্জন স্থান থেকে ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যায়। পরে সেগুলো ভাঙারি পট্টিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ট্রান্সফরমার চুরির প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রত্যন্ত এলাকায় মাইকিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানি করা হচ্ছে।
লোডশেডিংকে কাজে লাগাচ্ছে চোরেরা
ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে লোডশেডিংয়ের একটি যোগসূত্র রয়েছে বলেও মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে চোরদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো এলাকায় ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে নাকি চুরি হয়েছে— তা অনেক সময় গ্রাহকরা দ্রুত বুঝতে পারেন না। তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিক লোডশেডিং মনে করেন। এই সুযোগে চোরেরা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত অ্যালার্মিং। গ্রাহকদের সচেতন করা ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলার বিকল্প নেই।
তবে লোডশেডিং প্রসঙ্গে তিনি জানান, মতলব উত্তর জোনাল অফিস নিজস্বভাবে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। মতলব উত্তরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৭ মেগাওয়াট। কিন্তু কখনো ৮, কখনো ১০, ১২ কিংবা ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়েই লোড নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছা করলেই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
গ্রাহকদের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও একই সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। দিন-রাত গ্রাহকদের ফোন ও অভিযোগ সামলাতে হচ্ছে। গ্রাহক যেমন বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে আছেন, আমরাও এর বাইরে নই।
মতলব উত্তর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান জানান, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি জানান, ইদানীং ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে। রাতের টহল টিম বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি জানান, ট্রান্সফরমার চুরি রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। এলাকাবাসীকেও সচেতন হতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির চলাফেরা দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
এফএ/এএসএম
বিজ্ঞাপন