জাতীয়

সার্টিফিকেট মানে চাবি, ভেতরের কাজগুলোর জন্য কর্মদক্ষতা প্রয়োজন

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
5 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা আফজাল হোসেন। নারায়ণগঞ্জ জোন ইয়ুথ গ্রুপের হেড অব এইচআরএম হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এই খাতে কাজ করতে আগ্রহী কেমন তরুণ চান, তাদের সমস্যা-সম্ভাবনা ও নিজের প্রত্যাশার কথা জানালেন জাগো নিউজকে।  জাগো নিউজ: আরএমজি সেক্টরে কাজের সুযোগ কেমন? আফজাল হোসেন: আরএমজি সেক্টরে টোটাল জনবল কিন্তু কম নয়। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ লোক এখানে কাজ করছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৬০০ থেকে  ৮০০ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে ২৩০-এর অধিক লিড সার্টিফাইড প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৯০ প্লাস গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে। কিন্তু এখনো দক্ষ জনশক্তির অনেক ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট, কমপ্লায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল, ইঞ্জিনিয়ার, প্রোডাকশন প্ল্যানিং, অপারেশনাল, এইচআর লেভেলে। এই লেভেলগুলোতে বড় ধরনের গ্যাপ রয়েছে। জাগো নিউজ: যারা আছেন, তাদের ঘাটতি ‍মূলত কোথায়? আফজাল হোসেন: আর এই যে প্রযুক্তির দ্রুততম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য কিন্তু দক্ষ ম্যানপাওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন। আমাদের জনবল আছে, কিন্তু আসলে কর্মযোগ্য এবং দক্ষ জনশক্তির অভাব। শিক্ষিত ও  জ্ঞানী মানুষ অনেক আছে, কিন্তু সৎ এবং যোগ্য বাঙালির অভাবে আমাদের দেশের অনেক বড় বড় কোম্পানিতে বিদেশি সিইওরা রাজত্ব করছেন। আমাদের জনশক্তিকে যদি আমরা জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারি, তাহলে কখনই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখতে পারব না। জাগো নিউজ: প্রচুর গ্র্যাজুয়েট বেরুচ্ছে। তাদের দুর্বলতাগুলো কী? আফজাল হোসেন: শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা সবাই চাকরি চায়, কেউ কাজ করতে চায় না। সবাই অফিসার হতে চায়, কিন্তু আসলে কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। আর এই সেক্টরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার অভাব। অনেক সময় কাজের চাপের সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়েরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। যারা দক্ষ, তারা যেরকম বেতন পাওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি বেতন প্রত্যাশা করে। এই কারণে এখানে একটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। আবার যে সফট স্কিলগুলো আমাদের দরকার, (যেমন কমিউনিকেশন স্কিল) সেখানেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। জাগো নিউজ: সার্টিফিকেট নাকি অভিজ্ঞতা-দক্ষতা, কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেন? আফজাল হোসেন: আমাদের কাছে দুই ধরনের সিভি আসে, তবে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড শক্তিশালী এ রকম সিভি বেশি আসে। আমাদের দেশে আসলে হয় কি, একাডেমিকভাবে যারা একটু ভালো ছাত্র বলে আমরা যাদের বুঝি, তারা একাডেমিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে, তখন তারা বাইরের স্কিলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। কিন্তু আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, একাডেমিক যোগ্যতা আপনার চাবি। এই চাবি দিয়ে আপনি লক খুলে বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু বাসার ভেতরে যাওয়ার পর আপনার রান্নাবান্না করা, ঘর গোছানো, অনেক কাজ থাকে। আপনি সার্টিফিকেটটা পেলেন মানে চাবিটা পেলেন, কিন্তু বাসার ভেতরের কাজগুলো করার জন্য আপনার যে কর্মদক্ষতা প্রয়োজন, সেটা কিন্তু আসবে আপনার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে। সেই জায়গায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। জাগো নিউজ: আপনারা কেমন সিভি চান, কেমন সিভি পান? আফজাল হোসেন: আমার কাছে সবচেয়ে বেশি যে সিভিগুলো আসে, সিসিপি! আমি বলি সিসিপি, অর্থাৎ, কাট, কপি, পেস্ট! এই সিভিগুলো বেশি আসে। একবার আমার কাছে এসেছে বিএসসি পাস করা একটা ছেলের সিভি, লেখা ট্রিপল-ই। তাকে বললাম, ভাইয়া, আপনার সিভিতে ট্রিপল-ই লেখা কেন? আপনি তো টেক্সটাইলে বিএসসি করেছেন। সে বলে, স্যার, আমি আসলে আমার এক বন্ধুর সিভি কপি করে আমারটা বানিয়েছি! এই কারণে … আসলে কাট-কপি করে সিভি বানানো ঠিক না। জাগো নিউজ: সিভি কেন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ? আফজাল হোসেন: সিভি হচ্ছে আপনার আয়না, এটা আপনাকে রিপ্রেজেন্ট করবে। আপনি যদি মনে করেন যে এখানে কাজের দায়িত্ব লিখে শেষ করবেন, সেটা আসলে সিভি নয়। সিভিতে থাকবে আপনার অ্যাচিভমেন্ট, সিভি কখনো আপনার দায়িত্বের বর্ণনা হতে পারে না। আপনি জীবনে কী কী অ্যাচিভ করেছেন, কী অ্যাচিভ করতে চান; এটাই হবে আপনার সিভির সামারি। সিভিতে আরও কিছু তথ্য ভুল থাকে বা গ্যাপ থাকে বলে আমি মনে করি। সবাই স্কিলের তালিকা দেয়, কিন্তু আসলে তার বাস্তব প্রমাণ থাকে না। ক্যারিয়ার অবজেক্টিভ থাকে অস্পষ্ট। আপনি আসলে কোন পজিশনে চাকরি করবেন, সেটা বলা থাকে না। বানান ভুল থাকে, ভাষাগত ভুল থাকে, সিগনেচার থাকে না, ডেটের জায়গায় ডেট থাকে না, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য থাকে। যেগুলো আসলে সিভিতে একেবারেই বেমানান। আপনার চেয়েও আপনার সিভিটা হওয়া চাই অনেক বেশি স্মার্ট। কেননা, আপনি যত জায়গায় যেতে না পারবেন, আপনার সিভি তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গায় যাবে। সুতরাং আপনার চেয়েও আপনার সিভিটা বেশি স্মার্ট হওয়া প্রয়োজন। জাগো নিউজ: চাকরিপ্রার্থী তরুণদের ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কী পরামর্শ দেবেন?   আফজাল হোসেন: নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে কমিউনিকেশন স্কিলের গ্যাপ দেখতে পাই। সমস্যা সমাধান করার ক্ষেত্রে তাদের ধৈর্যের একটা গ্যাপ দেখতে পাই। কর্মক্ষেত্রে কীভাবে শৃঙ্খল হতে হবে অথবা একটা একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে এসে একটা কর্মপরিবেশে কোন কোন বিষয়গুলো বজায় রাখতে হবে; এগুলো রাখতে গিয়ে তারা খুব বেখেয়ালি হয়ে যায়। যেটা কর্মপরিবেশের জন্য একেবারেই বেমানান। আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবলেম যেটা, সেটা হচ্ছে ইগো। তাদের ইগো এত বেশি যে, খুব সহজে তারা মানুষকে মূল্যায়ন করতে চায় না, সম্মান করতে চায় না। এই জায়গা থেকেও আমাদের তরুণরা অনেক পিছিয়ে পড়ছে। আমার এক বস বলতো ‘ওয়ার্কলেস পিপল’দের কারণে প্রোডাক্টিভিটি কমছে, অপারেশনাল কস্ট বাড়ছে, কাজের কোয়ালিটি নিম্নমানের হচ্ছে, কমপ্লায়েন্সের রিস্ক তৈরি হচ্ছে; ইভেন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আপনি যদি স্কিলফুল না হন, আপনি বা আপনার প্রতিষ্ঠান কখনই টিকে থাকবে না। সুতরাং স্কিলফুল হওয়াটা খুব বেশি জরুরি। জাগো নিউজ: একজন অনভিজ্ঞ তরুণের অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কী? আফজাল হোসেন: একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট যদি নতুন চাকরিতে জয়েন করে এবং সঠিক মেন্টরিং, সঠিক বস পেয়ে যায়; আমি মনে করি ৬ মাস থেকে ১ বছরই তার জন্য যথেষ্ট। কারো ভেতরে যদি শেখার মানসিকতা না থাকে, ব্যক্তিত্ব গঠনের মানসিকতা না থাকে, তাহলে কেউ আপনাকে আপনার সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে না। এ জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন; সেটা হলো নিজের কন্ট্রিবিউশন। আপনি যত বেশি নিজেকে কন্ট্রিবিউট করতে পারবেন, আপনি যত বেশি নিজেকে ঢেলে সাজাতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে আপনি তত পারফেক্ট একজন এমপ্লয়ি হয়ে উঠবেন। জাগো নিউজ: কী পেলে একজন কর্মী দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন? আফজাল হোসেন: ভিশন-মিশন আকারে তিনটা কথা সবসময় বলি এবং আমি আমার মালিকদেরও বারবার বলেছি— সম্মান, স্বীকৃতি, ক্যারিয়ার গ্রোথ। যে প্রতিষ্ঠানটা সম্মান, স্বীকৃতি ও ক্যারিয়ার গ্রোথ নিশ্চিত করে, সেখানে এমপ্লয়িদের সার্ভিস লেন্থ হয় অনেক বেশি। কর্মভার কখনো মানুষকে দুর্বল করে না; তাকে দুর্বল করে ফেলে খারাপ বস, খারাপ কর্মপরিবেশ, খারাপ সিস্টেম। মনে রাখবেন, মানুষ কখনো কাজ করতে পারে না, সিস্টেম উইল ওয়ার্ক, নট ম্যানপাওয়ার! আপনি যত বড় যোগ্য লোক হন না কেন, সিস্টেমের গ্যাঁড়াকলে পড়লে আপনি ব্যর্থ প্রমাণিত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আরও পড়ুন ইন্টারভিউতে বেসিক প্রশ্নগুলো জেনে আসতে হবে জাগো নিউজ: আপনি এইচআর বা মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। এই বিভাগ একটি প্রতিষ্ঠানে কতটা জরুরি? আফজাল হোসেন: এইচআর হচ্ছে একটা কোম্পানির হার্ট। আপনার হার্টে ছিদ্র থাকলে যেমন আপনি বাঁচবেন না, একটা কোম্পানির এইচআর কাঠামো যদি দুর্বল হয়, সেই প্রতিষ্ঠানটাও আস্তে আস্তে সিস্টেমের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। আমাদের এইচআরের ওপর যেটা ইফেক্ট পড়ে- টার্নওভার রেট বেড়ে যায়, নতুন এমপ্লপিদের আবার ট্রেনিং করাতে হয়, যে শূন্যস্থানে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, কর্মপরিবেশ উপযোগী করে তুলতে হয়। একটা কাজের মধ্যে যে গ্যাপ তৈরি হয়, এখানেও আমাদের এইচআরকে অনেক এফোর্ট দিতে হয়। এজন্য আমরা সবসময় সাসটেইনেবল এমপ্লয়িগুলোকে ধরে রাখার জন্য সব সেকশন এবং সেকশন প্রধানদের এমফাসাইজ করে থাকি।  শাহজালাল/এমআইএইচ/আরএমডি
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>