বিজ্ঞাপন
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জীবনে অগণিত নেয়ামত দিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি নেয়ামতের কথা হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুটি নেয়ামত এমন যে, এগুলোর কদর অনেকেই বোঝে না। অনেকেই এগুলোকে অপব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। এই দুই নেয়ামতের একটি হচ্ছে ভালো স্বাস্থ্য, আর অন্যটি হচ্ছে হাতে অবসর সময় থাকা।
ফ্রি টাইম বা বেকার সময় পেলে তা অনেকেই নষ্ট করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে হায়াত দিয়েছেন, তা তো মূলত সময়ই। দিন, রাত, মাস কিংবা বছর—এসবই তো সময়। এটা আল্লাহর মহামূল্য নেয়ামত। সময় নষ্ট করা আর জীবন নষ্ট করা তো একই বিষয়।
আল্লাহ তাআলা নবীজিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, আপনি যখনই ব্যস্ততা থেকে অবসর পাবেন, তখনই ইবাদতে লেগে যান এবং আপনার রবের প্রতি মনোযোগী হন। অর্থাৎ নামাজে দাঁড়িয়ে যান, আল্লাহর ইবাদত শুরু করুন এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে থাকুন। সুতরাং একজন মুমিনের জীবনে অলস বা বেকার সময় বলতে কিছু থাকতে পারে না। কাজ নেই বলে সময় নষ্ট করার সুযোগ মুমিনের জীবনে কখনোই হতে পারে না।
অবসর সময় পেলে একজন মুমিন চিন্তা করবে, সে কিছুটা কোরআন তিলওয়াত করবে, আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, জিকির করবে কিংবা দুই রাকাত নফল নামাজ পড়বে। এভাবেই মুমিন তার জীবনকে কাজে লাগায়। প্রতিদিনের আমল দিয়ে সে নিজেকে আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন, পাঁচটি জিনিস আসার আগেই যেন পাঁচটি জিনিসকে গনিমত মনে করে কাজে লাগানো হয়। বার্ধক্য আসার আগেই যৌবনকে ভালো কাজে লাগাতে হবে। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ার আগেই সুস্থ থাকাকালে প্রচুর নেক আমল জোগাড় করে নিতে হবে, কারণ অসুস্থ অবস্থায় ইচ্ছা থাকলেও অনেক আমল করা যায় না।
তেমনিভাবে, চরম ব্যস্ততা আসার আগেই অবসর সময়কে ভালো কাজে ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী রাখেন, অভাব-অনটন থেকে মুক্ত রাখেন, তখন সেই সুযোগকেও কাজে লাগাতে হবে। দারিদ্র্য আসার আগেই দান-সদকা করে আখেরাতের পাথেয় নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম / কেউ খারাপ আচরণ করলে কী করবেন?
সবচেয়ে বড় কথা হলো, মৃত্যু আসার আগেই পুরো জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে লাগাতে হবে। কারণ মৃত্যু আসতে কতক্ষণ সময় লাগে? কেয়ামতের দিন বনি আদমের দুই পা আল্লাহর সামনে থেকে এক চুলও নড়তে দেওয়া হবে না, যতক্ষণ না সে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয়।
তার মধ্যে প্রথম প্রশ্নটি হলো, সে তার সম্পূর্ণ হায়াত বা বয়সকে কীভাবে ও কোন কাজে ব্যবহার করেছে? দ্বিতীয়ত, তার যৌবনকালকে কীভাবে ব্যয় করেছে? তৃতীয় ও চতুর্থ প্রশ্ন হলো, সে কীভাবে ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে এবং তা কোন পথে খরচ করেছে? আর পঞ্চম প্রশ্নটি হলো, সে যে জ্ঞান অর্জন করেছিল, তার কতটুকু আমলে রূপান্তর করেছে?
আরেকটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা হাদিসে কুদসিতে বলেন, হে বনি আদম! তুমি আমার ইবাদতের জন্য কিছু সময় বের করো, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরিয়ে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য দূর করে দেব। আর যদি তুমি তা না করো, তবে তোমার অন্তরে এত ব্যস্ততা ঢুকিয়ে দেব যে তোমার আর হুশ থাকবে না, কেবল দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতেই থাকবে; তবুও তোমার অভাব কখনো শেষ হবে না।
ইমাম হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, হে বনি আদম! তুমি তো মূলত কতকগুলো দিনের সমষ্টি। একটি দিন চলে যাওয়া মানে তোমার জীবনেরই একটি অংশ খসে যাওয়া।
তিনি আরও বলেছেন, কোনো বান্দার প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও দুর্ভাগ্যের লক্ষণ হলো, আল্লাহ তাকে বেহুদা ও অকল্যাণকর কাজে ব্যস্ত রেখে দিয়েছেন। আল্লাহর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকে অনর্থক কাজকর্ম ও আনন্দ-ফুর্তিতে বুঁদ করে রাখা বান্দার জন্য এক ধরনের অভিশাপ।
তিনি বলেন, আমি সালফে সালেহীনদের এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা টাকা-পয়সার চেয়েও সময়কে বেশি মূল্যবান মনে করতেন এবং সময়কে হেফাজত করার বিষয়ে চরম সতর্ক ছিলেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, যে দিন সূর্য উঠলো এবং ডুবে গেল, কিন্তু আমি আমার নেক আমল বৃদ্ধি করতে পারলাম না, সেই দিনটির জন্য আমার আফসোসের সীমা থাকে না।
তবে এর মানে আবার এ রকম নয় যে, আপনি সারা দিনই নামাজে-জিকিরে ডুবে থাকবেন। পরিবারকেও সময় দিতে হবে। প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি কাজও করতে হবে। সঠিক নিয়ত থাকলে দুনিয়াবি কাজও ইবাদত গণ্য হয়। সারাদিন ইবাদতে ডুবে থেকে পরিবারকে সময় না দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।
হজরত হানজালা (রা.) একবার নবীজির (সা.) কাছে এসে বললেন যে, আপনার দরবারে থাকলে আখেরাতের কথা মনে থাকে, কিন্তু বাড়িতে গিয়ে পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটালে সেই ভাব বজায় থাকে না। তখন নবীজি (সা.) তাকে বুঝিয়ে দিলেন, সময়কে ভাগ করে নিতে হবে; কিছু সময় আল্লাহর জন্য, আর কিছু সময় পরিবারের হকের জন্য রাখতে হবে।
আরও পড়ুন
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম / কোরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বলতেন, আমি শেষ রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করার সময়টাকে যেমন সওয়াবের কাজ মনে করি, তাহাজ্জুদে ওঠার উদ্দেশ্যে রাতে ঘুমোনোকেও তেমন সওয়াবের কাজ মনে করি। কারণ আমার নিয়ত থাকে শরীরকে সতেজ করে ইবাদত শুরু করা।
আমরা পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোতেও আল্লাহর তাআলাকে মনে রাখবেন। তার বিধান অনুসরণ করবেন। তার উত্তম প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করবেন।
সূত্র: ইটিউটিউব চ্যানেল মুসলিম উম্মাহ-এ প্রকাশিত শায়খ আব্দুল কাইয়ুমের বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন