বিজ্ঞাপন
ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার ব্যয় ঘিরে উঠেছে নানান প্রশ্ন। প্রকল্পে ৬৮টি অডিট আপত্তিতে অনিষ্পন্ন রয়েছে চার হাজার ২৫ কোটি টাকার হিসাব। ধীরগতি ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার চিত্রও উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে।
দেশে ইউরিয়া সারের উৎপাদন বাড়াতে নরসিংদীর পলাশে নির্মিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ সার কারখানাটি। সরকারের মেগা প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি। কারখানার উৎপাদন অংশের কাজ পুরোপুরি শেষ। আবাসনসহ প্রকল্পের আরও কিছু কাজ এখনো বাকি। সব মিলিয়ে হিসাব মিলছে না চার হাজার কোটি টাকার।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১০ মার্চ। সাত অর্থবছরে মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। আপত্তিগুলো মূলত ঠিকাদারকে বিল প্রদানে ভ্যাট-ট্যাক্স কর্তনজনিত বিধি-বিধান লঙ্ঘনের।
আরও পড়ুন
ঢাকায় পানির চাহিদা মেটাতে হবে ৭ কৃত্রিম জলাধার
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ইউরিয়া সারের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষকদের কাছে সুলভমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তা চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে দৈনিক দুই হাজার ৮শ মেট্রিক টন গ্রানুলার ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক পরিবেশবান্ধব সার কারখানা স্থাপন।
বর্তমানে প্রকল্পটি স্থানীয় শিল্পায়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রকল্পটি যথাসময়ে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইএমইডি রাজস্ব বাজেটের আওতায় নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পরিচালনা করে। বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
৬৮ অডিট আপত্তি, হিসাব নেই ৪ হাজার কোটি টাকার
আইএমইডি গত সাত অর্থবছরে মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু নিষ্পন্ন হলেও এখনো হিসাব মিলছে না চার হাজার কোটি টাকার।
আপত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে- উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বিধানবহির্ভূতভাবে পেনশন দেওয়ার কারণে ২৮ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৪ টাকা ক্ষতি। অন্য অ্যাকাউন্টে তহবিল স্থানান্তরের কারণে প্রকল্পের ক্ষতি ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বিসিআইসির কর্মীদের গ্র্যাচুইটি বাবদ অর্থ পরিশোধের কারণে ক্ষতি ৯৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৪০ টাকা।
আরও পড়ুন
১৫ বছর ঝুলে আছে কাজ, গুলশান-বনানী-বারিধারার মানববর্জ্য এখনো পড়ছে লেকে
ড্রয়িং ও ডিজাইন অনুযায়ী প্রয়োজন অপেক্ষা অতিরিক্ত মাটি ভরাট করার কারণে ঠিকাদারকে দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। কাজ বাস্তবায়ন ছাড়া ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে প্রকল্পের ক্ষতি হয়েছে ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৩৬ টাকা।
অতিরিক্ত কাজ সম্পাদন করার কারণে ঠিকাদারকে ৮ লাখ ২২ হাজার ৪৬৫ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে, যা প্রকল্পের আর্থিক ক্ষতি। বিধান লঙ্ঘন করে ফটোকপি মেশিন, ওয়াকি-টকি, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, এক্সিকিউটিভ চেয়ার, কার্পেট, ফ্লোর ম্যাট ইত্যাদি কেনায় ৭৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৪০ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে।
অডিট আপত্তিতে আরও উঠে এসেছে, ১ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার ৫০৫ টাকার সমন্বয় ভাউচার জমা না দেওয়ায় ব্যয়ের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক ক্ষমতার অর্পণ না মেনে যানবাহন মেরামত বাবদ ৮ লাখ ৮৫ হাজার ২২২ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ব্যাংক সুদ জমা না দেওয়ার কারণে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি ১ কোটি ২১ লাখ ১২ হাজার ৪৯৮ টাকা।
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে প্রোগ্রেস শিডিউল প্রাপ্তি ছাড়াই ঠিকাদারকে ১০৪ কোটি ৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২৫০ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। অসংযুক্ত অবস্থায় নির্মাণসামগ্রীর পরীক্ষা করানোর কারণে ঠিকাদারকে অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে ১১ লাখ ৪০ হাজার ১০২ টাকা। প্রকল্পের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের কারণে অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ২৮৮ টাকা।
আরও পড়ুন
কম খরচের ‘স্পিড পোস্টে’ প্রাণ ফিরেছে ডাক বিভাগে
এছাড়া উৎপত্তির দেশ ও ভেন্ডর পরিবর্তন করে সরঞ্জাম সরবরাহের কারণে ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, সমঝোতা স্মারক ছাড়া রেলওয়েকে অগ্রিম পরিশোধ বাবদ ৫০ কোটি টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে। ডিপিপির বিধান বহির্ভূতভাবে পেনশন দেওয়ায় প্রকল্পের ক্ষতি ৭০ লাখ ৬১ হাজার টাকা।
ল্যাম-সাম টার্ন-কি অংশের আওতায় বিদেশ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিল পরিশোধ করার কারণে সরকারি অর্থের ক্ষতি ৭ কোটি ৫২ হাজার টাকা। জিওবির লেগুন ফিলিং প্রক্রিয়ায় বিল পরিশোধের কারণে অনিয়মিত ব্যয় সাড়ে ১২ কোটি টাকা।
সমঝোতা স্মারক ছাড়াই তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডকে অগ্রিম দেওয়ার কারণে ৩৩ কোটি টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। ঠিকাদার কর্তৃক দাখিল করা পোর্ট ও শিপিং এজেন্ট ডিটেনশন চার্জের সম্ভাব্য ব্যয়ের কারণে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করে বিল পরিশোধ করায় অনিয়মিত ব্যয় ১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সরকারি কোষাগারে ভ্যাট ও আইটি জমা না দেওয়ায় সরকারি রাজস্বের ক্ষতি ৬২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। লাইসেন্স ফি খরচের পরিবর্তে সিকিউরিটি ডিপোজিট দেখিয়ে ২ কোটি টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
রেললাইন স্থাপনের জন্য প্রকল্পের ডিপোজিট ওয়ার্ক খাত থেকে রেলওয়েকে অর্থ প্রদানের কারণে ২১৫ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা ও অব্যবহৃত আসবাবপত্রের কারণে ১ কোটি ৬৭ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।
আরও পড়ুন
৯৯৭ কোটির প্রস্তাবিত আরেকটি প্রকল্পেও বগুড়ার শিবগঞ্জ
ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদনে যাওয়ার পরও পিজিটিআর সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পের টাকা থেকে গ্যাসের বিল পরিশোধ করার কারণে প্রকল্পের ক্ষতি হয়েছে ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
এছাড়া আরও বেশ কিছু খাতে ক্ষতি ও অনিয়মিত ব্যয় পেয়েছে আইএমইডি।
অডিট আপত্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অডিট আপত্তি আসবে আবার নিষ্পত্তিও হবে। ৬৮ ধরনের অডিট আপত্তির সব জবাব ব্রডশিটে জমা দেওয়া হয়েছে।-বিসিআইসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) এস এম সোহেল আহাম্মদ
আইএমইডির অডিট আপত্তি প্রসঙ্গে বিসিআইসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) এস এম সোহেল আহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘অডিট আপত্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অডিট আপত্তি আসবে আবার নিষ্পত্তিও হবে। ৬৮ ধরনের অডিট আপত্তির সব জবাব ব্রডশিটে জমা দেওয়া হয়েছে।’
প্রকল্প প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, ‘বর্তমানে প্রকল্পের কিছু নির্মাণ কাজ চলমান। তবে দৈনিক দুই হাজার ৮শ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পেলে উৎপাদন আরও বাড়তো।’
আলোচ্য নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা কার্যক্রমে আইএমইডি সমীক্ষা অনুযায়ী প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, পণ্য ও সেবার গুণগতমান পর্যালোচনা, সরেজমিন পরিদর্শন এবং মিশ্র গবেষণা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের (কৃষক, সার ডিলার, কর্মকর্তা/কর্মচারী) অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর জরিপ, কেআইআই, এফজিডি, কেসস্টাডি পরিচালনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
ঢাকা-সিলেট চার লেন / মাটির নিচে পরীক্ষায় ‘ফাঁকি’, ‘গলার কাঁটা’ ইউটিলিটি
তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শেষে নরসিংদী জেলার ছয়টি উপজেলা ও গাজীপুর জেলার দুটি উপজেলায় প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংযোজন, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও অংশীজনদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদনটি অধিকতর তথ্যসমৃদ্ধ করা হয়েছে।
মে ২০২৬ পর্যন্ত কারখানাসহ প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
আইএমইডি জানায়, বর্তমানে সার কারখানার বাণিজ্যিক উৎপাদন কার্যক্রম চলমান। মে ২০২৬ পর্যন্ত কারখানাটি প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করেছে। ফলে সার আমদানিনির্ভরতা কমছে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে থাকায় কারখানাটি পরিবেশবান্ধব শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
চীনা ঋণেই হচ্ছে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ লাইন
আধুনিক এ ইউরিয়া সার কারখানাটির মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান কৃষির চাহিদা পূরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আমদানিনির্ভরতা কমানো অন্যতম লক্ষ্য। প্রকল্পটি ৯ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। মূল প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
প্রথম সংশোধিত মেয়াদ ছিল অক্টোবর ২০১৮ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত। ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার ৫শ কোটি টাকা। জুন ২০২৬ সালে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও আনুষঙ্গিক অনেক কাজ এখনো বাকি।
প্রথম সংশোধিত মেয়াদের মধ্যে মূল কারখানার কাজ শেষ করা হয়। ২০২৪ সালে কারখানার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি টেস্ট রান সম্পন্ন করা হয়। বর্তমানে সার কারখানাটিতে শতভাগ উৎপাদন কার্যক্রম চলমান।
প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত মেয়াদে নির্মাণকাজের মধ্যে আবাসিক কলোনি ও অন্য নির্মাণকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ পর্যন্ত। মে ২০২৬ পর্যন্ত হাউজিং নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ এবং কারখানাসহ ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ৯০ দশমিক ০৩ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
প্রকল্পের বর্ধিত সময়ে দেশের পটপরিবর্তনের ফলে বিরাজমান অস্থিরতা, মালামাল পরিবহনে বিঘ্ন, স্থানীয় বাধা-বিপত্তি, অতিবৃষ্টি প্রভৃতি কারণে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় পুনরায় দুই বছর অর্থাৎ, ২০২৮ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা রয়েছে। ফলে মূল পর্যায়ের তুলনায় প্রকল্পের সময় বাড়বে ৭২ মাস বা ১৬০ শতাংশ এবং ব্যয় বাড়বে ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
এমওএস/এএসএ
বিজ্ঞাপন